বৃহস্পতিবার
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস

পাসপোর্ট অফিসে ‘দরবেশ বাবা’, দৈনিক আয় ৪ লাখ!

সাইফুল্লাহ আমান
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম
ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক শাহজাহান কবির। ছবি: এনপিবি গ্রাফিক্স
expand
ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক শাহজাহান কবির। ছবি: এনপিবি গ্রাফিক্স

জুলাই মাসে ৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রবাসীরা। এই জেলার বাসিন্দারা সম্প্রতি বিদেশমুখী। যে কারণে জেলার পাসপোর্ট অফিসও ব্যস্ত সময় পার করছে। কিন্তু বিদেশে যেতে অত্যাবশ্যকীয় এই নথি করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রাহকরা। পাসপোর্ট অফিস ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি দালালচক্র, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘চ্যানেল’।

অভিযোগ রয়েছে, এই ‘চ্যানেল’ পরিচালনা করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক শাহজাহান কবির। পাসপোর্ট আবেদনকারীদের কাছে তিনি পরিচিত ‘দরবেশ বাবা’ নামে।

এই চ্যানেলের মাধ্যমে না গেলে পাসপোর্ট হয় না কারো। চ্যানেলের মাধ্যমে গেলেই সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে জনগণকে কাজ ভেদে দিতে হয় ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অনিয়ম, দুর্নীতি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং সাধারণ আবেদনকারীদের হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অফিসের ভেতরে কথিত ‘চ্যানেল’ দালালদের অবাধ বিচরণ এবং বহিরাগতদের সরকারি অফিস ব্যবহার করে সরকারি কম্পিউটার ও সার্ভারে কাজ করার মতো ঘটনাও ঘটে। যা এনপিবি নিউজের অনুসন্ধানে (ভিডিওতে) উঠে এসেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বলয় গড়ে উঠেছে বর্তমান উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের নেতৃত্বে। এছাড়া সহকারী হিসেবে ‘চ্যানেল’ পরিচালনায় রয়েছেন উপসহকারী পরিচালক মোর্শেদুল হক ও সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীন। এই চক্রের বিষয়ে ভয়ে মুখ খোলেন না ভুক্তভোগী ও অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই তাকে হেনস্থা করা হয় উপপরিচালক শাহজাহান কবিরের প্রশ্রয়ে। এমন অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

সরেজমিনে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন সেবা নিতে আসা মানুষের ভিড়। আবেদনকারীদের অনেকেই সরাসরি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে কাজ করতে চান। কিন্তু ‘চ্যানেল’ না ধরে আসায় নানা ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে তাদের ফাইল ফেরত দেওয়ার অভিযোগ করেন।

অথচ একই কাগজপত্র দিয়ে কথিত ‘চ্যানেল’ এর মাধ্যমে ফাইল জমা হলেই সমস্যাগুলো আর থাকে সমস্যা থাকে না। এসব সমস্যা মুহূর্তেই সমাধানের জন্য ফাইলভেদে ‘চ্যানেল’-কে দিতে হয় সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ কোনো সীমা নেই। যার ফাইল যত জরুরি তার টাকার পরিমাণও বেড়ে যায়।

সরকারি অফিসে বসে কম্পিউটারে কাজ করেন দালাল

এনপিবির অনুসন্ধানে আরও গুরুতর একটি বিষয় সামনে আসে। সরেজমিনে দেখা যায়, অফিসের অভ্যন্তরে জহির নামে বহিরাগত ব্যক্তি কম্পিউটারে বসে পাসপোর্ট-সংক্রান্ত কাজ করছেন।

এ সময় দোতলার একটি কক্ষে কয়েকজন কথিত দালালকে ওই ব্যক্তির কাছে কাগজপত্র নিয়ে আসতে দেখা যায়। তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি একটি আবেদনপত্র দিয়ে মুখ আড়াল এবং দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

পরে তাকে সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনের কক্ষের দিকে যেতে দেখা যায়। সেখান থেকে বের হওয়ার সময় গেটে থাকা আনসার সদস্যের কাছেও একটি আবেদনপত্র দিয়ে দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। পরে পুলিশের সহায়তায় তাকে আটক করা হলে তিনি আবারও জয়নাল আবেদীনের কাছে যান। এ সময় ক্যামেরার সামনে জয়নাল আবেদীন ওই ব্যক্তিকে চেনেন না বলে দাবি করেন।

পরবর্তীতে তাকে উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের কাছে নেওয়া হয়। সেখানে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন উপপরিচালক। অন্যায়ের কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তার পক্ষে অবস্থান নেন শাহজাহান কবির।

পরবর্তীতে এনপিবির কাছে ওই ব্যক্তি স্বীকার করেন, তিনি একসময় আনসার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন পাসপোর্ট অফিসে আসেন এবং বিভিন্ন কাজ করে দেন। কীভাবে কার অনুমতি নিয়ে তিনি কাজ করেন এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি। তবে তার সঙ্গে ‘চ্যানেল’ এর সরাসরি যোগাযোগ আছে।

সরকারি অফিসের অনুমোদিত জনবলের বাইরে কোনো ব্যক্তি সরকারি কম্পিউটার ও সার্ভারে কাজ করতে পারেন কি না উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের কাছে জানতে চায় এনপিবি। কিন্তু তিনি এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে ওই ব্যক্তির পক্ষে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসের বিভিন্ন কক্ষে কিছু মানুষ কোনো বাধা ছাড়াই ঢুকছেন এবং বের হচ্ছেন। এরা সবাই দালালচক্রের সদস্য বলে জানান পাসপোর্ট অফিসেরই কয়েকজন কর্মকর্তা। এসব দালালদের অবাধে চলাফেরার সুযোগ করে দিয়েছেন শাহজাহান কবির বলেও অভিযোগ করেন এনপিবির কাছে।

এদিকে আউটসোর্সিং কাজে নিয়োগকৃত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নৈশপ্রহরীদের নিজেদের কাজের বাইরে গিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে দেখা গেছে। যা তাদের কার্যপরিধির মধ্যে পড়ে না। তবুও তারা এসব কাজ করছেন যা সরকারি অফিসের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

দৈনিক ৪-৫ লাখ টাকার বেশি আয়ের অভিযোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাসপোর্ট অফিসের প্রতিদিন গড়ে ৩০০টির বেশি আবেদন জমা পড়ে। এর বড় একটি অংশ কথিত ‘চ্যানেল’ দালালদের মাধ্যমে আসে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি আবেদনে গড়ে প্রায় ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করে ‘চ্যানেল’ চক্র। সাধারণ জনগণের কাছ থেকে অবৈধভাবে দৈনিক ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আত্মসাত করে চক্রটি।

দালালচক্র ‘চ্যানেল’- এর মাধ্যমে আদায় করা টাকা প্রতি বুধবার বিকেলে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় বলে জানিয়েছেন একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আদায়কৃত টাকার মূল অংশ উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের কাছে যায় এবং বাকিটা বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ভাগ করা হয়।

এ বিষয়ে দালালচক্র ‘চ্যানেল’-এর একজন সদস্য এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘মোট আদায়কৃত টাকার অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ যায় উপপরিচালকের ড্রয়ারে। বাকি টাকা আমাদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। এখানে ডেজিগনেশন দিয়ে নির্ধারিত হয় কে কত টাকা পাবে।’

এসব বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের মুখোমুখি হয় এনপিবি নিউজ টিম। তবে কোনো অভিযোগেরই সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

পাসপোর্ট অফিসের এসব বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি কবি আব্দুল মান্নান এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘এই জেলাটিকে সবসময় নেগেটিভ ব্র‍্যান্ডিং করা হয়। অথচ কেউ পজিটিভ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। পাসপোর্ট অফিসের এই ভোগান্তি বহুদিনের। এরসাথে পাসপোর্টের সব লেভেলের কর্মকর্তারা জড়িত বলে মনে হয়। নইলে এত অভিযোগের পরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন?’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা দুদক কার্যালয়ে পাসপোর্ট অফিসের বিষয়ে বহু অভিযোগ রয়েছে বলে জানান একজন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনপিবি নিউজকে তিনি বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসের প্রায় প্রতি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিষয়ে আলাদা করে অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও বেশ কয়েকবার তদন্ত করা হয়েছিল। অভিযানও পরিচালনা করা হয়। এরপরে কয়েকদিন ভালো চলে, কিন্তু এরপরেই আবার আগের অবস্থায় চলে যায়। এখানে আমাদেরও আসলে খুব বেশি কিছু করার থাকে না। আমরা ব্যবস্থা নিতে চাইলে সাংবাদিক, সরকার সব জায়গা থেকেই চাপ আসে।’

পাসপোর্ট অফিসের অনিয়মগুলো তুলে ধরে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিস আমার আওতাধীন নয়। তবুও আমার জেলার নাগরিকরা যদি কোনো ধরনের সমস্যা এবং প্রতিবন্ধকতার শিকার হন তবে অবশ্যই আমরা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আমাদের একটি অভিযোগ সেল রয়েছে জেলায়। জনগণকে আহ্বান করবো, সেখানে আপনাদের যেকোনো সমস্যার কথা আমাদের বলুন। এর আগেও পাসপোর্ট অফিস নিয়ে অনেক অভিযোগ শোনা গেছে। আমরা নিশ্চিতভাবেই এর প্রতিকার করার চেষ্টা করবো।’

এ বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) এটিএম আবু আসাদের মুঠোফোনে বারবার কল দিলেও তারা রিসিভ করেননি। এরপর তাদের হোয়াট্‌সআপে মেসেজ দিলেও কোনো রিপ্লাই মেলেনি। তাই তাদের বক্তব্য জানতে পারেনি এনপিবি নিউজ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন