বৃহস্পতিবার
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
কাগজে একতলা, সড়কে দোতলা

স্লিপার বাসের আড়ালে লুকানো ‘মৃত্যুফাঁদ’

শাহীন মাহমুদ রাসেল
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৯ পিএম
expand
স্লিপার বাসের আড়ালে লুকানো ‘মৃত্যুফাঁদ’

ঝকঝকে রং, আধুনিক নকশা। ভেতরে চোখধাঁধানো আলোর ঝলকানি, শোয়ার জন্য আলাদা খোপ। বাইরে থেকে দেখলে বিলাসবহুল কোনো যান মনে হতে পারে। দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই মাঝখানে সরু করিডোর, দুপাশে ওপর-নিচে ছোট ছোট কেবিন। কোথাও শোয়ার আসন, কোথাও চেয়ার। কম খরচে শুয়ে শুয়ে দূরপাল্লার ভ্রমণের সুযোগ থাকায় এসব ‘স্লিপার বাস’ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যাত্রীদের মধ্যে। ঢাকা, কক্সবাজার, সিলেট, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে প্রতিদিন চলছে এমন বাস।

কিন্তু আরামের এই আবরণের আড়ালেই তৈরি হয়েছে বড় নিরাপত্তাঝুঁকি। সাধারণ একতলা বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে বানানো হচ্ছে দোতলা স্লিপার কোচ।

অথচ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বলছে, ডাবল ডেকার স্লিপার কোচ হিসেবে এসব বাস চলাচলের অনুমোদন নেই।

সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ড সেই ঝুঁকির বাস্তব চিত্র সামনে এনেছে। কোথাও প্রাণ গেছে, কোথাও স্থানীয় মানুষের তৎপরতায় অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন যাত্রীরা। এর মধ্যেই হাইকোর্টে দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, দেশের সড়ক-মহাসড়কে চলছে ৮২৯টি স্লিপার বাস।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ডাবল ডেকার স্লিপার কোচ হিসেবে এসব বাসের বৈধ অনুমোদন নেই।

জানা গেছে, ৭ আগস্ট সকালে সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বেঙ্গল ও ইউনিক পরিবহনের দুটি বাসের সংঘর্ষে নিহত হন নয়জন। আহত হন অন্তত ২৪ জন। ড্যাশক্যামের ভিডিওতে দেখা যায়, বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউনিক পরিবহনের বাসটিকে ধাক্কা দেয়। পরে ইউনিক বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। নিহতদের মধ্যে এক শিশু ও বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবীও ছিলেন।

এর ১০ দিন পর, ১৭ আগস্ট ভোরে কুমিল্লার দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী রয়েল কক্সের একটি স্লিপার কোচে আগুন লাগে। সামনে থাকা একটি যানকে ধাক্কা দেওয়ার পর বাসটিতে আগুন ধরে যায়। দ্রুত পুরো বাসে আগুন ছড়িয়ে পড়লেও সৌভাগ্যক্রমে সব যাত্রী বের হয়ে আসতে সক্ষম হন।

এরপর ২১ আগস্ট দিবাগত রাতে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের একটি এসি বাসে আগুন লাগে রামুর কলঘর বাজার এলাকায়। বাসটিতে ছিলেন ২৫ থেকে ৩০ জন যাত্রী। আগুনের খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জানালার কাচ ভেঙে যাত্রীদের বের করে আনেন। পরে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটি ও ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরমকে আগুনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হয়।

এর আগে ২২ মার্চ ফেনীর রামপুরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি যানবাহনে দোয়েল পরিবহনের একটি স্লিপার বাস ধাক্কা দিলে তিনজন নিহত হন। আহত হন আরও পাঁচজন। দ্রুতগতির বাসটি একের পর এক দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনে ধাক্কা দেয়। পরে পুলিশ চারটি বাস ও দুটি মোটরসাইকেল জব্দ করে।

দুর্ঘটনার পাশাপাশি স্লিপার বাসের কাঠামো নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, একটি বাসের চেসিস দেশে আসার পর প্রথমে সাধারণ একতলা বাসের বডি তৈরি করে বিআরটিএর অনুমোদন ও নিবন্ধন নেওয়া হয়। এরপর সেটি নেওয়া হয় স্থানীয় বডি বিল্ডিং গ্যারেজে। সেখানে মূল কাঠামো পরিবর্তন করে একতলা বাসকেই রূপ দেওয়া হয় দোতলা স্লিপার কোচে।

হাইকোর্টে স্লিপার বাস নিয়ে রিট করা আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান বলেন, আইন অনুযায়ী চেসিস আমদানির পর সেটির অনুমোদন নিতে হয়। চেসিসের ওপর বডি তৈরি হলেও তার অনুমোদন প্রয়োজন বিআরটিএর। কিন্তু স্লিপার বাসের ক্ষেত্রে অনেক সময় এই নিয়ম মানা হচ্ছে না।

তার অভিযোগ, প্রথমে সাধারণ একতলা বাসের বডি অনুমোদন নিয়ে নিবন্ধন করা হয়। পরে গ্যারেজে নিয়ে সেটির কাঠামো পরিবর্তন করে বানানো হচ্ছে দোতলা বা স্লিপার বাস। এসব পরিবর্তনের অনেকটাই হচ্ছে স্থানীয় গ্যারেজে, যেখানে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নেই। ঝুঁকি শুধু কাঠামো পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ নয়। বাড়ানো হচ্ছে আসনসংখ্যাও। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি সাধারণ এসি বাসে যেখানে প্রায় ৩২টি আসন থাকে, কোনো কোনো স্লিপার বাসে সেই সংখ্যা ৪৫ পর্যন্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ একই চেসিসের ওপর বাড়ানো হচ্ছে কাঠামো, আসন এবং যাত্রীর সংখ্যা। এতে বাড়ছে বাসের মোট ওজন। যাত্রী ও মালামালের অতিরিক্ত চাপও পড়ছে চেসিসের ওপর। ফলে বাসের ভারসাম্য, নিয়ন্ত্রণক্ষমতা ও যান্ত্রিক নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি।

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, দেশের বেশির ভাগ সিঙ্গেল ডেকার বাস পরিবর্তন করে স্লিপার বাস বানানো হচ্ছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী নেওয়া হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে। এসব বাসের বিরুদ্ধে সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

স্লিপার বাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু এর কাঠামো নিয়ে নয়, জরুরি মুহূর্তে যাত্রীদের বের হওয়ার পথ নিয়েও। অধিকাংশ বাসে সামনের দিকে, চালকের পেছনে, মূল দরজা একটি। ফলে দুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ডের সময় সামনের অংশে থাকা চালক, সহকারী কিংবা সুপারভাইজার দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারলেও পেছনের খোপে থাকা যাত্রীদের জন্য বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে যেতে পারে।

রামুর সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড যেন সেই আশঙ্কারই বাস্তব উদাহরণ। বাসে আগুন লাগার পর চালক ও কর্মীরা বের হয়ে যেতে সক্ষম হলেও যাত্রীদের বের করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জানালার কাচ ভাঙতে হয়েছে।

হুজ্জাতুল ইসলাম খানের ভাষ্য, কোনো বাসে আগুন বা বড় দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রীদের দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। এভাবে এসব বাস চলতে থাকলে এগুলোকে ‘চলন্ত মৃত্যুফাঁদ’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড এবং আদালতে বিষয়টি ওঠার পর স্লিপার বাস নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে বিআরটিএ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, আমিনবাজার ও মানিকনগরের বিভিন্ন বডি বিল্ডিং গ্যারেজে অভিযান চালানো হয়েছে। কোথাও জরিমানা, কোথাও গ্যারেজ সিলগালা, আবার কোথাও বাস জব্দ করা হয়েছে। ১৯ আগস্ট যাত্রাবাড়ীর সামির মৃধা জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি, বাসের কাঠামো পরিবর্তন ও অবৈধ গ্যারেজ পরিচালনার অভিযোগে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মোট আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এর আগের দিন গাবতলী, আমিনবাজার ও মানিকনগরের ১০ থেকে ১২টি বডি বিল্ডিং গ্যারেজে অভিযান চালানো হয়। চারটি গ্যারেজকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মেরামতের সময় আটটি গাড়ি ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়। চলাচলের অনুপযোগী দুটি স্লিপার বাস জব্দ করা হয়। ‘নিউ ডিসেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’ নামের একটি গ্যারেজ সিলগালা করা হয়।

কক্সবাজারেও ১৯ আগস্ট জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ ও পুলিশের যৌথ অভিযান হয়। অনুমোদনহীন আসনবিন্যাস ও কাঠামোগত পরিবর্তন এবং ফিটনেস সনদ না থাকার অভিযোগে লন্ডন এক্সপ্রেস, দোয়েল এক্সপ্রেস, সেন্টমার্টিন পরিবহন ও ইম্পেরিয়াল এক্সপ্রেসসহ পাঁচটি বাসের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ঘটনাস্থলে আদায় করা হয় এক লাখ টাকা জরিমানা।

বিআরটিএ কক্সবাজার সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক মো. আব্দুল্লাহ খান বলেন, স্লিপার বাসের বিষয়ে এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বসা হয়নি। চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযান চলছে। সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান কীভাবে হবে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।

স্লিপার বাসের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন এখন আদালতেও। ২০২৫ সালে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান। চলতি বছরের ২০ আগস্ট শুনানিতে বিআরটিএ আদালতকে জানায়, দেশের সড়কে বর্তমানে ৮২৯টি স্লিপার বাস চলছে।

সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বাসের ডাবল ডেকার স্লিপার কোচ হিসেবে চলাচলের অনুমোদন নেই। তিনি বলেন, বিআরটিএ চাইলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা সিভিল প্রশাসনের সহায়তায় এসব বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের মতে, বিআরটিএ একদিকে এসব বাসকে অনুমোদনহীন বলছে, অন্যদিকে সেগুলো প্রকাশ্যে মহাসড়কে চলছে। এটি সংস্থাটির দ্বিমুখী আচরণ।

তার প্রশ্ন, রাজধানী থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া এসব বাস বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত, হাইওয়ে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখের সামন দিয়েই চলাচল করছে। তাহলে অনুমোদনহীন হলে এতদিন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?

হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অ্যাডমিন ডিআইজি হাবিবুর রহমান খান বলেন, কোনো যানবাহন বৈধ না অবৈধ এবং কোন যানবাহনকে লাইসেন্স দেওয়া হবে, তা নির্ধারণের মূল কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ। বিআরটিএ কোনো যানবাহনকে অবৈধ ঘোষণা করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য হাইওয়ে পুলিশকে জানালে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

তার ভাষ্য, হাইওয়ে পুলিশের মূল দায়িত্ব সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো যানবাহন বৈধ না অবৈধ, তা নির্ধারণ করা তাদের মূল দায়িত্ব নয়। বিআরটিএ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দিলে তারা সহযোগিতা করবেন। এভাবেই স্লিপার বাসের দায় যেন এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরের দিকে ঘুরছে। অথচ বাসগুলো থেমে নেই। প্রতিদিন শত শত যাত্রী নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছে সেগুলো।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো মোটরযানের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, আসনবিন্যাস কিংবা মূল অবয়নে পরিবর্তন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ এর মধ্যেই দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৮২৯টি স্লিপার বাস চলাচলের তথ্য সামনে এসেছে। জরিমানা হচ্ছে। গ্যারেজ সিলগালা হচ্ছে। বাস জব্দ হচ্ছে। আদালতে রিট চলছে।

হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান খান অবশ্য আশাবাদী। তার ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাই এর একটি সমাধান বের হবে। কিন্তু সেই সমাধান না আসা পর্যন্ত রাতের মহাসড়কে ছুটে চলা প্রতিটি স্লিপার বাসের যাত্রীদের জন্য আরাম আর নিরাপত্তার মধ্যে থেকে যাচ্ছে বড় এক ফাঁক। বাইরে ঝকঝকে আলো। ভেতরে নরম বিছানা। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে বের হওয়ার পথ কোথায়, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অন্ধকারেই।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন