শনিবার
০১ আগস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
০১ আগস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাইকে মুছে ফেলতে ‘ডিপ পাওয়ারের’ ষড়যন্ত্র চলছে: জাহিদুল ইসলাম

এনপিবিনিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা ও সমালোচনার পর নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান শক্তির বাইরে একটি প্রভাবশালী ‘ডিপ পাওয়ার’ কাজ করছে, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে পারস্পরিক বিরোধ এড়িয়ে ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, জুলাইয়ের অর্জন ও চেতনা দুর্বল করতে নানা ধরনের তৎপরতা চলছে।

পোস্টে তিনি লেখেন, যারা আমাকে ফলো করেন বা বিগত সময়ের আমার কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত আছেন, তারা জানেন—ব্যক্তিগতভাবে আমি শুধু শুভাকাঙ্ক্ষীদের নয়, সমালোচক ও আদর্শিক প্রতিপক্ষের মতামতকেও সম্মান করি— ছাত্রশিবির আমাকে সেটাই শিখিয়েছে। সেই সম্মানের জায়গা থেকে সংক্ষেপে আমার কিছু চিন্তা ও উপলব্ধি তুলে ধরতে চাই।

১. এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতি যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তারা অবশ্যই জানেন—কীভাবে ডিপ স্টেট বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর রাজনীতিকে নিজেদের পছন্দমতো প্রভাবিত করতে নানা ষড়যন্ত্র করে। পারস্পরিক শত্রুতা, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত সৃষ্টি করে তারা রাজনৈতিক সুযোগ গ্রহণ করে। আমরা অনেক সময় এসব ঘটনাকে দৃশ্যমান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক বিরোধ বলে মনে করলেও, এর পেছনের শক্তি অধরাই থেকে যায়।

২. হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের হামলাকে আমি পরিকল্পিত বলেছি, কিন্তু কোথাও পরিকল্পনাকারী হিসেবে এনসিপি বা বিএনপির নাম উল্লেখ করিনি। আমি স্পষ্টভাবে বলেছি—“ডিপ পাওয়ার।” প্রশ্ন হলো, ডিপ পাওয়ার কোন দল নিয়ন্ত্রণ করে? বাস্তবতা হলো, ডিপ পাওয়ার কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে থাকে না; বরং তারাই বিভিন্ন দলকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সাধারণ মানুষ বা জনপরিসরে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনাই করতে দেওয়া হয় না। শহীদ ওসমান হাদী এই ট্যাবু কিছুটা ভাঙার চেষ্টা করেছিল, যার পরিণতি ছিল তাঁর শাহাদাত। মনে রাখবেন, যত দিন ডিপ পাওয়ার সক্রিয় থাকবে, তত দিন গণতন্ত্র একটি প্রহসনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং ইনসাফের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

৩. জুলাই-পরবর্তী সময়ে জুলাই যোদ্ধা কিংবা এনসিপির ওপর যত হামলা হয়েছে, দলীয়ভাবে ছাত্রশিবির ও জামায়াত সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। গতবছর গাজীপুরে হাসনাতের গাড়িতে হামলার পর তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও প্রতিবাদ, গোপালগঞ্জের ঘটনায় দ্রুত সাংগঠনিক পদক্ষেপ—এসব বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা ভালো করেই জানেন। হবিগঞ্জের ঘটনার পরপরই ছাত্রশিবির বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমরা সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছি। আমীরে জামায়াত আহত ভাইটিকে দেখতে গিয়েছেন। সিলেটের সংগঠনও পাশে দাঁড়িয়েছে। জুলাই ও দেশের স্বার্থেই জামায়াত ও ছাত্রশিবির এই নৈতিক দায়িত্ব পালন করেছে।

৪. আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এনসিপি নিজেদের গতিতেই স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হবে, সেটাই প্রয়োজন। কিন্তু ডিপ স্টেটের কৌশলে এনসিপির সঙ্গে জামায়াতের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা কিংবা রাতারাতি ৬ আসনের দল থেকে ১৬০ আসনের দল হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জামায়াতবিরোধিতার পথে ঠেলে দিয়ে এনসিপিকে বন্ধুহীন ও দুর্বল করার একটি প্রচেষ্টা রয়েছে—এটি সচেতন মহল নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবেন। কারণ, এনসিপিকে দুর্বল করা গেলে জুলাইয়ের শক্তিকেও দূর্বল ও বিতর্কিত করা যাবে—এটাই তাদের লক্ষ্য। আমি আশা করি, এনসিপির নেতৃবৃন্দ প্রকৃত ষড়যন্ত্রটি উপলব্ধি করবেন।

৫. বিএনপিকে আমি দুটি ধারায় দেখি। একটি ধারা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক চেতনাকে ধারণ করে—তাঁদের আমি আন্তরিকভাবে সম্মান করি। অপর অংশটি ডিপ পাওয়ারের প্রভাবে নিজেদের ও দেশবিরোধী স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। আমরা বাংলাদেশপন্থী বিএনপিকে সব সময় সমর্থন দিয়ে যাব। তবে দ্বিতীয় ধারার বিষয়ে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। Politics

৬. বিএনপি আমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের অন্যতম সঙ্গী। আমি আশা করি, তারা ফ্যাসিবাদীদের দেখানো রাজনীতির পথে না হেঁটে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করবে। আওয়ামী লীগ ও হাসিনার পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ পরিচালনা করবে।

৭. জুলাইকে মুছে ফেলার জন্য জুলাইবিরোধী শক্তি ও ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্র চলছে, যা আমরা অনেকেই হয়তো অনুধাবন করতে পারছি না। তারা কয়েকটি প্রক্রিয়ায় এই কাজ করছে—

এক. জুলাই মাসজুড়ে আলোচনায় থাকার কথা ছিল জুলাইয়ের স্মৃতি, শহীদ ও আহতদের ত্যাগ এবং বিপ্লবের প্রেরণা। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন ইস্যুকে সামনে এনে জুলাইকে আলোচনার বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

দুই. জুলাই মাসে সরকার ও বিরোধী দলের মূল আলোচনার বিষয় হওয়ার কথা ছিল আওয়ামী লীগের বিচার এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নতুন বাংলাদেশ গঠন। কিন্তু বাস্তবে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়িই বেশি হচ্ছে। ফলে গণহত্যাকারী হাসিনা ও তার দল আলোচনা থেকে আড়ালে চলে যাচ্ছে।

তিন. বিরোধী দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিয়ে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোকে নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত রাখা।

৮. আমার পোস্টে বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির কিছু সমীকরণের কথা আছে। এই ভূখণ্ডের ইতিহাস—আর্য, পাল, সেন, সুলতানি, মুঘল, নবাবি, ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগ, ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ এবং ১৯৭১-পরবর্তী সময় থেকে ২০২৪ পর্যন্ত—যাঁরা গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন, তাঁরা বিষয়টি সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন যে, এ দেশের রাজনীতিকে একটি অদৃশ্য শক্তি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত করে আসছে। যা ১৯৭১-পরবর্তী সময়ে এবং ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর আরও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। মনে রাখবেন, ডিপ পাওয়ার নিজেদের স্বার্থে যখন কাউকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়, তখন একই সঙ্গে তার জন্য একটি ফাঁদও তৈরি করে রাখে।

৯. জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে জামায়াত, বিএনপি, এনসিপিসহ গণঅভ্যুত্থানের সব পক্ষ এবং দেশপ্রেমিক বাংলাদেশপন্থী সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐক্যকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকেই আমি এই ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করি।

আমি মনে করি, জুলাইয়ের সব শক্তি ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশ পথ হারাবে না এবং জুলাইকে কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।

১০. রাজনীতিতে যা দৃশ্যমান, তা অনেকটা আইসবার্গের চূড়ার মতো; যার মূল অংশটি থাকে পানির নিচে। তাই জামায়াত, বিএনপির (বাংলাদেশপন্থী অংশ), এনসিপি এবং সব দেশপ্রেমিক দল ও মানুষকে দৃশ্যমান রাজনীতির পাশাপাশি অদৃশ্য বাস্তবতাও অনুধাবন করতে হবে। তা না হলে ক্ষতি শুধু কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়; পুরো দেশেরই হয়।

১১. পরিশেষে, আমার কোনো পোস্ট, লেখা বা বক্তব্যে কখনো কেউ ব্যক্তিগতভাবে কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। ভবিষ্যতে শব্দচয়নে আরও সতর্ক থাকার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব ব্যক্তি, দল ও জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অবিরাম। তবে ডিপ পাওয়ারের রাজনীতির বিরুদ্ধে আমরা সব সময় আপসহীন থাকব। এই প্রশ্নে দেশপ্রেমিক সবার সহযোগিতা ও সচেতনতা কামনা করছি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন