

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সারা বিশ্বের মুসলমানরা পবিত্র কাবা শরীফের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, যখন এটিকে এর নতুন কিসওয়া (আবরণ) দিয়ে সজ্জিত করা হয়। এই দৃশ্যটি সূক্ষ্ম যত্ন এবং দক্ষতা ও কারুশিল্পের এক দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে।
যদিও প্রথম দৃষ্টিতে কিসওয়াকে একটি একক, অবিচ্ছিন্ন পোশাক বলে মনে হতে পারে, প্রকৃতপক্ষে এটি সাত ধরনের ভিন্ন ভিন্ন বস্ত্র দিয়ে তৈরি একটি অত্যাধুনিক শৈল্পিক ও প্রকৌশলগত কাজ। প্রতিটি বস্ত্রের একটি নির্দিষ্ট কার্যকারিতা রয়েছে যা এর গঠন, সৌন্দর্য এবং স্থায়িত্বে অবদান রাখে, যার ফলে ইসলামের পবিত্রতম স্থানের জন্য উপযুক্ত একটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
কিসওয়া তৈরির কাজ শুরু হয় এর প্রধান বস্ত্র—কালো রেশম—দিয়ে, যা এর বাইরের আবরণ তৈরি করে এবং একে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত রূপ দান করে।
এর পাশাপাশি থাকে এমবস করা কালো রেশম, যার উপর কিসওয়ার স্বতন্ত্র ইসলামিক লিপি এবং আলংকারিক নকশা বোনা হয়, যা একে এক অনন্য নান্দনিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করে। ভেতরের দিকে, অফ-হোয়াইট সুতি কাপড় আস্তরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা পোশাকটিকে শক্তি ও স্থায়িত্ব প্রদান করে। অন্যদিকে, সাদা সুতি কাপড় কিসওয়ার বিভিন্ন অংশকে অবলম্বন দেওয়ার জন্য এবং এর কাঠামোগত দৃঢ়তা বাড়ানোর জন্য একটি অতিরিক্ত আস্তরণ হিসেবে কাজ করে।
কিসওয়ার সাথে সম্পর্কিত কিছু আলংকারিক উপাদান এবং বিশেষ অংশে লাল রেশম ব্যবহার করা হয়, আর পবিত্র কাবাঘরের দরজার পর্দার আড়ালে সবুজ রেশম ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, এমবস করা সবুজ রেশম কাবাঘরের ভেতরের আবরণের জন্য সংরক্ষিত থাকে, যা এর ব্যবহারের বৈচিত্র্য এবং প্রতিটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের জন্য উপকরণ নির্বাচনের সূক্ষ্মতাকে প্রতিফলিত করে।
কাপড়ের এই বৈচিত্র্য কিসওয়া উৎপাদনে নিবেদিত যত্নের স্তরকে তুলে ধরে, যা কেবল নিখুঁত নান্দনিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রযুক্তিগত এবং প্রকৌশলগত প্রয়োজনীয়তাগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে, যা পোশাকটির গুণমান, স্থায়িত্ব এবং সারা বছর ধরে এর রূপ ধরে রাখার ক্ষমতা নিশ্চিত করে।
এই সাত ধরনের কাপড়, যা একটি একক সমন্বিত প্রক্রিয়ায় একত্রিত হয়, কিসওয়া উৎপাদনের স্বতন্ত্র উৎকর্ষকে প্রতিফলিত করে, যা এটিকে অন্যতম নিখুঁত এবং বিশিষ্ট ইসলামী কারুশিল্পে পরিণত করেছে। এটি পবিত্র কাবা শরীফের প্রতি প্রদত্ত নিরন্তর যত্নের এক সাক্ষ্যস্বরূপ, যেখানে জাগতিক গুণমান মিলিত হয়।
পবিত্র কাবা শরিফের কিসওয়াহ তৈরির সংক্ষিপ্ত সাতটি ধাপে তৈরি হয় কিসওয়াহ।
১. লবণমুক্তকরণ: কাঁচা রেশম ধোয়া ও রং করার জন্য ব্যবহৃত পানি প্রস্তুত করা হয়।
২. ধৌতকরণ ও রংকরণ: রেশম থেকে মোম অপসারণ করা হয় এবং এটিকে কালো (বাইরের আবরণের জন্য) ও সবুজ (ভেতরের আস্তরণ এবং নবীর কক্ষের জন্য) রঙে রঞ্জিত করা হয়।
৩.যান্ত্রিক বয়ন: রঞ্জিত রেশমের সুতাগুলোকে ভারী কাপড়ের টানা স্পুলে রূপান্তরিত করা হয়।
৪. মুদ্রণ: সাধারণ কাপড়ের উপর কুরআনের আয়াত এবং নকশা নিখুঁতভাবে ছাপানোর জন্য সিল্ক-স্ক্রিনিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
৫. সংযোজন ও সেলাই: কাপড়ের অংশগুলোকে একসাথে জোড়া লাগানো হয় এবং সূচিকর্মের জন্য নির্দিষ্ট স্থান প্রস্তুত করা হয়।
৬. স্বর্ণালঙ্কার: রুপা এবং সোনার প্রলেপযুক্ত রুপার তার ব্যবহার করে ক্যালিগ্রাফি সেলাই করা হয়, যা তুলা দিয়ে প্যাড করে একটি উঁচু, ত্রিমাত্রিক (3D) প্রভাব তৈরি করা হয়।
৭, গুণমান নিয়ন্ত্রণ: স্থাপনের পূর্বে কঠোর মানদণ্ড অনুযায়ী সমস্ত উপকরণ এবং কারুকার্য পরিদর্শন করা হয়।
উপকরণ: খাঁটি রেশম, রুপোর তার, সোনার প্রলেপযুক্ত রুপোর তার এবং তুলার প্যাডিং।
• ঐতিহ্য: প্রতি বছর মহররমের (ইসলামিক নববর্ষ) প্রথম দিনে কাবাকে তার নতুন কিসওয়াহ দিয়ে সজ্জিত করা হয়।