

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মানুষের গুনাহের অন্যতম বড় দরজা হলো চোখ। চোখের মাধ্যমে হারাম দেখা, নিষিদ্ধ দৃশ্য উপভোগ করা কিংবা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়—এমন কিছুর দিকে দৃষ্টি দেওয়া ইসলামে গুরুতর গুনাহ হিসেবে বিবেচিত।
কুরআন ও হাদিসে চোখের হেফাজতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রমজান মাস যেহেতু গুনাহ মাফ ও আত্মশুদ্ধির মাস, তাই এই সময়ে চোখের গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে চোখের গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। সূরা নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য পবিত্রতা রয়েছে।”
আরও পড়ুনঃ বাসা থেকে বের হওয়ার দোয়া ও শয়তান থেকে বাঁচার আমল।
একই নির্দেশ নারীদের জন্যও পরের আয়াতে এসেছে। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দৃষ্টি সংযত না করা শুধু বাহ্যিক গুনাহ নয়; বরং এটি অন্তরের পবিত্রতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। চোখের গুনাহ অন্তরকে অন্ধকার করে দেয় এবং ইবাদতের স্বাদ নষ্ট করে দেয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখের গুনাহকে অত্যন্ত ভয়ংকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি বলেন, “চোখও জিনা করে, আর তার জিনা হলো দেখা।” অর্থাৎ সরাসরি শারীরিক পাপের আগেই চোখের মাধ্যমে গুনাহ শুরু হয়।
এই কারণে ইসলাম শুধু বড় গুনাহ নয়, বরং গুনাহের পথ বন্ধ করতেও নির্দেশ দিয়েছে। রমজানে রোজা রাখার উদ্দেশ্যই হলো তাকওয়া অর্জন, আর তাকওয়ার অন্যতম অংশ হলো দৃষ্টিকে হারাম থেকে বাঁচানো।
আরও পড়ুনঃ সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার: রমজানে গুনাহ মাফের সেরা অস্ত্র।
চোখের গুনাহ মাফের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তরিক তাওবা। তাওবার তিনটি শর্ত রয়েছে: গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, গুনাহের জন্য অন্তরে অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা। রমজান মাসে এই তাওবা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি, কারণ এই মাসে আল্লাহ তাআলা নিজেই বান্দাদের ক্ষমা করতে চান।
সহিহ হাদিসে এসেছে, রমজানের প্রথম রাতেই শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয় এবং জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। চোখের গুনাহ মাফের জন্য যে দোয়াটি বিশেষভাবে পড়া যেতে পারে, তা হলো সাধারণ ইস্তিগফারের সঙ্গে অন্তরের অনুশোচনা যোগ করা।
যেমন, আল্লাহর কাছে এভাবে ক্ষমা চাওয়া যে, হে আল্লাহ, আমার চোখ দিয়ে আমি যে হারাম দেখেছি, তা তুমি ক্ষমা করে দাও। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইস্তিগফারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং নিজে দিনে বহুবার ক্ষমা চাইতেন, যদিও তিনি নিষ্পাপ ছিলেন।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, নবীজি দিনে সত্তরের বেশি বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। এটি উম্মতের জন্য শিক্ষা যে, চোখসহ সব অঙ্গের গুনাহ থেকে নিয়মিত তাওবা করা জরুরি।
আরও পড়ুনঃ "রাব্বানা জলামনা আনফুসানা...": নিজের ওপর জুলুম করলে যে দোয়া পড়বেন।
চোখের গুনাহ মাফের জন্য একটি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী দোয়া হলো আদম আলাইহিস সালামের দোয়া—“রাব্বানা জলামনা আনফুসানা…”। এই দোয়াটি কুরআনে বর্ণিত এবং এতে নিজের ওপর জুলুম করার স্বীকারোক্তি রয়েছে।
চোখের গুনাহ আসলে নিজের ওপরই জুলুম, কারণ এর মাধ্যমে মানুষ নিজের আখিরাত নষ্ট করে। এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া মানে হলো নিজের ভুল অকপটে স্বীকার করে নেওয়া।
রমজানে চোখের গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য দোয়ার পাশাপাশি আমলও জরুরি। কুরআন তিলাওয়াত, বিশেষ করে এমন আয়াত পড়া যেখানে তাকওয়া ও আল্লাহভীতির কথা এসেছে, তা চোখ ও অন্তরকে পবিত্র করে।
আলেমগণ বলেন, যে চোখ কুরআনের আয়াত দেখে অভ্যস্ত হয়, সে চোখ ধীরে ধীরে হারাম দৃশ্য থেকে ঘৃণা করতে শেখে। এছাড়া দরুদ শরিফ পাঠ করাও চোখের গুনাহ থেকে বাঁচার একটি উপায়, কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করলে অন্তরে নূর সৃষ্টি হয়।
রমজানে বিশেষ করে ইফতারের আগ মুহূর্ত এবং রাতের শেষ অংশে চোখের গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত উপকারী। হাদিসে এসেছে, রোজাদারের দোয়া ইফতারের আগে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। এই সময় যদি বান্দা চোখের গুনাহের জন্য কান্নাভেজা অন্তরে ক্ষমা চায়, তবে আল্লাহর রহমত থেকে সে বঞ্চিত হয় না।
উপসংহারে বলা যায়, চোখের গুনাহ মানুষের ঈমান ও ইবাদতের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। রমজান মাস হলো সেই গুনাহ থেকে ফিরে আসার সেরা সুযোগ। আন্তরিক তাওবা, নিয়মিত ইস্তিগফার, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং আল্লাহর কাছে বিনয়ের সঙ্গে দোয়ার মাধ্যমে চোখের গুনাহ মাফ পাওয়া সম্ভব। আল্লাহ তাআলা আমাদের চোখকে হারাম থেকে হেফাজত করুন এবং রমজানে আমাদের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন।
মন্তব্য করুন

