

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। জীবিত অবস্থায় যেমন তাঁদের খেদমত ও আনুগত্য ফরজের কাছাকাছি গুরুত্ব বহন করে, তেমনি তাঁদের ইন্তেকালের পরও সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং মৃত্যুর পর দোয়ার মাধ্যমে পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক আরও গভীর ও স্থায়ী হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে রমজান মাস, যা রহমত ও মাগফিরাতের মাস, এই সময়ে মৃত বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও ফলপ্রসূ। কুরআন ও সহিহ হাদিসে মৃত পিতা-মাতার জন্য দোয়ার গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা নিজেই পিতা-মাতার জন্য দোয়া শেখিয়েছেন।
সূরা আল-ইসরা আয়াত ২৪-এ আল্লাহ বলেন, “হে আমার রব, তাঁদের প্রতি দয়া করো, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।” এই আয়াত প্রমাণ করে যে, পিতা-মাতা জীবিত হোক বা মৃত—তাঁদের জন্য দোয়া করা সন্তানের ঈমানি দায়িত্ব। আলেমগণ বলেন, এই দোয়া শুধু দুনিয়ায় তাঁদের জন্য নয়, বরং আখিরাতেও তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়।
আরও পড়ুনঃ সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার: রমজানে গুনাহ মাফের সেরা অস্ত্র।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত বাবা-মায়ের জন্য দোয়ার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদিসে তিনি বলেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস চলমান থাকে—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মৃত পিতা-মাতার জন্য সন্তানের দোয়া তাঁদের আমলনামায় নেকি যোগ হতে থাকে। রমজান মাসে এই দোয়ার সওয়াব আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
রমজানে মৃত বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দোয়াটি পড়া উচিত, তা হলো ক্ষমা ও রহমতের দোয়া। আল্লাহর কাছে এভাবে প্রার্থনা করা উচিত যে, হে আল্লাহ, তুমি আমার পিতা-মাতাকে ক্ষমা করে দাও, তাঁদের কবরকে প্রশস্ত করে দাও এবং আখিরাতে তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করো।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানাজার নামাজে মৃতের জন্য যে দোয়াগুলো পড়তেন, সেগুলোর মূল বিষয়ও ছিল মাগফিরাত ও রহমত কামনা।
আরও পড়ুনঃ "রাব্বানা জলামনা আনফুসানা...": নিজের ওপর জুলুম করলে যে দোয়া পড়বেন।
রমজানে ইস্তিগফারের গুরুত্ব আরও বেশি। মৃত বাবা-মায়ের জন্য ইস্তিগফার করা মানে হলো তাঁদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করা। আলেমগণ বলেন, সন্তান যখন আন্তরিকভাবে বলে যে, হে আল্লাহ, আমার বাবা-মায়ের গুনাহ তুমি ক্ষমা করে দাও, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম দয়ার কারণে সেই দোয়া কবুল করেন।
বিশেষ করে ইফতারের আগ মুহূর্ত, তাহাজ্জুদের সময় এবং শেষ রাতে এই দোয়া করলে কবুল হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। রমজানে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব মৃত বাবা-মায়ের জন্য দান করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, যা বহু আলেমের মতে জায়েজ ও সওয়াবের কাজ। যদিও কুরআন তিলাওয়াত নিজেই বড় ইবাদত, কিন্তু সন্তানের পক্ষ থেকে এই সওয়াব বাবা-মায়ের জন্য পৌঁছে দিলে তা তাঁদের কবরের আজাব হালকা করতে পারে।
বিশেষ করে সূরা ইয়াসিন, সূরা মুলক ও সূরা ইখলাস পড়ার ব্যাপারে আলেমগণ বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ করেছেন, যদিও মূল ভিত্তি হলো যে কোনো নেক আমলের সওয়াব আল্লাহর ইচ্ছায় মৃতের কাছে পৌঁছে যায়।
আরও পড়ুনঃ চোখের গুনাহ মাফের জন্য রমজানে বিশেষ দোয়া
সদকা করাও মৃত বাবা-মায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। সহিহ হাদিসে এসেছে, এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁর মা হঠাৎ ইন্তেকাল করেছেন, তিনি কি তাঁর পক্ষ থেকে সদকা করতে পারেন? নবীজি উত্তরে বলেছেন, হ্যাঁ। এই হাদিস প্রমাণ করে যে, রমজানে বাবা-মায়ের নামে দান-সদকা করলে তার সওয়াব তাঁদের কাছে পৌঁছে।
রমজান মাস মৃত বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করার শ্রেষ্ঠ সুযোগ। সন্তানের আন্তরিক দোয়া, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত ও সদকার মাধ্যমে বাবা-মায়ের কবরের জীবন আলোকিত হতে পারে।
যাঁরা আমাদের দুনিয়ায় আসার মাধ্যম ছিলেন, তাঁদের জন্য রমজানে চোখের পানি ও অন্তরের দোয়া নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমলগুলোর একটি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রমজানে আমাদের মৃত পিতা-মাতার জন্য বেশি বেশি দোয়া করার তাওফিক দান করুন।
মন্তব্য করুন

