মঙ্গলবার
২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন চাপে বেকায়দায় জামায়াত

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৫১ পিএম
জামায়াত ইসলামীর লোগো
expand
জামায়াত ইসলামীর লোগো

ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে জামায়াতে ইসলামী। সংসদে এর আগে কখনো দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তমও হতে পারেনি দলটি। কিন্তু সেই অর্জনের আনন্দ স্থায়ী হয়নি বেশিদিন। প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসার কয়েক মাসের মধ্যেই একের পর এক বিতর্কে চাপের মুখে জামায়াত।

বিরোধী দলের নতুন ভূমিকায় দলটি রাজনৈতিকভাবে যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি বেড়েছে জনআকাঙ্ক্ষা ও নজরদারিও। দলের সংসদ সদস্যের (এমপি) ভিডিওকাণ্ড, সরকারি বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি এবং জোট রাজনীতিতে ভাঙন এ তিন ইস্যুর ত্রিমুখী চাপে এখন অনেকটাই বেকায়দায় দলটি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরোধী দলের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ‘অপ্রস্তুত’ জামায়াত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

নৈতিকতার প্রশ্নে কাউকে ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াত আমির। নেতাদের উদ্দেশে তার বার্তা, সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে তা বেশি স্পষ্ট হয়। তাই সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখলেও এগুলো ধারাবাহিক রূপ নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দলের দীর্ঘদিনের ‘নৈতিক ও স্বচ্ছ’ রাজনৈতিক ভাবমূর্তি। সে কারণেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতদলীয় এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জোর সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি। বিষয়টি আদর্শিক ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী উল্লেখ করে তাকে দল থেকে করা হয় বহিষ্কার।

জামায়াতের রাজনীতিতে এটাই প্রথম দলের কোনো নেতার বড় ধরনের নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ্যে আসা, যা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে।

জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানালেন, গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনা কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি দলের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে এটিকে শুধু একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে পর্যালোচনা করা হচ্ছে এর আইনগত, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সব দিক।

এর আগে সরকারি অনুদান ও ত্রাণ বিতরণে জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগও অস্বস্তিতে ফেলে দলটিকে। এরপরই দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরে দলীয় সব এমপির কাছে পাঠানো হয় লিখিত নির্দেশনা।

সেখানে সরকারি অনুদান, ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ), ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) কিংবা তাদের স্বজনদের জন্য কোনো ধরনের সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্থানীয় পর্যায়েও কঠোরতা দেখাতে শুরু করেছে দলটি। সরকারি বরাদ্দ বিতরণে অনিয়ম, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, নৈতিক স্খলনের মতো অভিযোগে একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নতুন আরেকটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে জোট রাজনীতি। হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে নতুন কওমিভিত্তিক রাজনৈতিক জোট গঠনের আলোচনা শুরুর পর ১১-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে গেছে খেলাফত মজলিস।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরও কয়েকটি দলের এই জোটে অবস্থান করা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে সংসদের বাইরে রাজনৈতিক সমীকরণেও নতুন চাপের মুখে পড়েছে জামায়াত। নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে কওমি ঘরানার দলগুলোকে বের করে আনার পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে।

জামায়াতের নেতারা বলছেন, সরকারবিরোধী রাজনীতির পাশাপাশি এখন দলকে সংসদ, জনপ্রতিনিধি, জোট ও জনআকাঙ্ক্ষা- চারটি ক্ষেত্রই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।

আগে আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতি করলেও রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে গিয়ে এখন মুখোমুখি হতে হচ্ছে নতুন বাস্তবতার। এক নেতা জানালেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রুকন সম্মেলনে জামায়াত আমির দলীয় নেতাদের উদ্দেশে দিয়েছেন স্পষ্ট বার্তা।

জনপ্রতিনিধি বা নেতাদের কোনো আচরণ যেন দলের আদর্শ ও জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, সে বিষয়ে দিয়েছেন হুঁশিয়ারি। ওই সম্মেলনে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে জামায়াত আমির বলেছেন, ‘ভেরি কেয়ারফুল! নৈতিকতার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীতে কোনো ছাড় নেই।’

জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা বলেন, ‘প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। অন্য দলের ক্ষেত্রে যেটি ছোট ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়, আমাদের ক্ষেত্রে সেটিই বড় বিতর্ক হয়ে যায়। কিছু ঘটনায় আমরা বিব্রত হয়েছি, বিশেষ করে গাজী নজরুলের ঘটনাটি দলের জন্য সবচেয়ে বড় ইমেজ সংকট তৈরি করেছে।’

দলটির নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের এমপি মুজিবুর রহমানের ভাষ্য, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো রাজনৈতিকভাবে দলের জন্য অস্বস্তিকর। তাই জনগণের আস্থা ও সংগঠনের নৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আরও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও জানালেন, ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিতর্ক এড়াতে এরই মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আইনুল ইসলাম বলছিলেন, ‘জামায়াত প্রথমবারের মতো বড় সংসদীয় শক্তি হয়েছে। ফলে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন জনপর্যবেক্ষণে। এ চাপ সামলাতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা- সবকিছুরই পরীক্ষা দিতে হচ্ছে দলটিকে।

সূত্র: আগামীর সময়

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন