


মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন—প্রতিটি অধ্যায়ে ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এ সংগঠনটি রাজনীতিকে অন্য পথে নিয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো “ট্যাগের রাজনীতি”।
মূলত স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে কিংবা দলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে ছাত্রলীগের একটি অংশ “বিরোধী দল, জামায়াত বা শিবিরপন্থী”—এমন ট্যাগ লাগিয়ে দিত। এ ধরনের ট্যাগ হয়ে উঠত অস্ত্রের মতো। যার ওপর এই ট্যাগ লাগত, সে সমাজে হেয়প্রতিপন্ন হতো, অনেকে প্রশাসনের হয়রানির শিকার, এই ট্যাগ তার জীবনকেও কেড়ে নিত। অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতাও এই ট্যাগ দিয়ে মেটানো হতো।
আমরা আবরার ফাহাদের একটি উদাহরণ দেখতে পারি। তিনি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন—ভারতকে দেওয়া সুবিধাগুলো (যেমন পানি, জ্বালানি, সমুদ্রবন্দর ব্যবহার, ট্রানজিট ইত্যাদি) বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে কতটা যৌক্তিক? তা নিয়ে আবরার ফাহাদ প্রশ্ন তোলেন। তারপরই আবরারকে শিবির ট্যাগ দিয়ে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে (সন্ধ্যা ৮টার দিকে) শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে যায় ছাত্রলীগের (বুয়েট শাখা) কয়েকজন নেতা-কর্মী। কক্ষে নিয়ে তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়েই তাকে ক্রিকেট স্টাম্প ও মোটা তার দিয়ে পুরো শরীরে বেধড়কভাবে পিটিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করা হয়।
কয়েক দফায় বিভিন্ন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা পালাক্রমে তাকে মারতে থাকে। এভাবে সারা রাত তাকে নির্যাতন করা হয়। আমরা জানি তারপর আবরারের কি হয়েছিল।
ট্যাগ রাজনীতি কেবল প্রতিপক্ষ দমনে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ছাত্রলীগের ভেতরেও গ্রুপিং বা নেতৃত্বের লড়াইয়ে একে অপরকে ‘বিরোধী ট্যাগে’ আঘাত করেছে। ফলে সংগঠনের ভেতরকার গণতান্ত্রিক চর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকৃত নেতা তৈরির পরিবর্তে ‘কে বেশি ট্যাগ লাগাতে পারে’—তা-ই যেন প্রভাবশালী হওয়ার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই রাজনীতি সমাজে ভয়, অবিশ্বাস ও বিভাজন বাড়িয়েছে। তরুণরা যেখানে আদর্শ, নীতি ও মুক্তচিন্তার চর্চা করার কথা, সেখানে তারা ট্যাগ ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার সহজ পথ বেছে নিয়েছে। এতে দলীয় ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
ছাত্রলীগ যদি সত্যিই আদর্শ রাজনীতির সংগঠন হিসেবে টিকে থাকতে চাইত, তবে তাদের ট্যাগ রাজনীতির এই কালিমা থেকে বেরিয়ে আসতে হতো। প্রয়োজন ছিল ভিন্নমতকে সহনশীলভাবে গ্রহণ করা, গঠনমূলক বিতর্কে অংশ নেওয়া এবং আদর্শ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব তৈরি করা। তাহলে আজকে তাদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।
ট্যাগ রাজনীতি ক্ষণস্থায়ী লাভ দিলেও গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘস্থায়ী হুমকি বয়ে আনে। ছাত্রদলের উচিত ছাত্রলীগের পরিণতি থেকে যথাযথ শিক্ষা নেওয়া এবং ইতিহাসের গৌরবময় ধারায় ফিরে গিয়ে জিয়াউর রহমানের আদর্শের রাজনীতি করা। যেখানে প্রতিপক্ষকে দমন নয়, বরং যুক্তি ও আদর্শ দিয়ে জেতার সংস্কৃতির চর্চা করা।
এ দেশের জনগণ দেখিয়ে দিয়েছে অধিকার নিয়ে (কোটা) আন্দোলন করার সময় শেখ হাসিনা “রাজাকার” ট্যাগ দিয়ে এ জনগণকে কিভাবে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। এ ট্যাগ দেওয়ার পর তার আর এই দেশ নিশ্বাস নেওয়ার সময় হয়নি। দেশ থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে দিল্লিতে।
সুতরাং ট্যাগের রাজনীতি করে এ দেশে কেউ টিকে থাকতে পারবে না, সেটা জনগণ প্রমাণ করেছে। ভবিষ্যতে ট্যাগের রাজনীতি এ দেশের জনগণ মেনে নেবে না।
সে দিন দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টকশো চলাকালীন সময়ে প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে তাকে ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়েছেন ছাত্রদল মনোনীত এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের মানুষ সেটা দেখেছে। সাদিকুল ইসলাম মাসুম প্রশ্ন করেছিলেন, ‘‘ডাকসু প্রতিবছর হওয়া আমাদের মৌলিক অধিকার। দেখা যাচ্ছে, আপনারা ৯০-এর ডাকসুতে ফিরে যেতে চাইছেন, অথচ শিক্ষার্থীরা সে সময় ডাকসুকে ডাকাতের কবলে সুশাসন বলে অভিহিত করেছিল।
৯০-এর ডাকসু নির্বাচনের পর দীর্ঘ ২৮ বছর আপনারা কৌশলে ডাকসু নির্বাচন আর হতে দেননি। এবারও জয়ী হলে কি ২৮ বছরের জন্য ডাকসু বন্ধ থাকবে? এবং বলা হয়, গণরুম ও গেস্টরুম প্রথা আপনারাই চালু করেছিলেন।
জয়ী হলে কি ফের গণরুম ও গেস্টরুম চালু করবেন?’’ তার প্রশ্নের জবাবে তানভীর আল হাদী মায়েদ বলেন, ‘‘আপনি যদি সাধারণ শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন তাহলে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’’ তাকে সাথে সাথেই ট্যাগ দিয়ে বলেন, ‘‘কিন্তু আমার মনে হয়, আপনি একজন শিবির কর্মী। আর শিবির কর্মী হওয়ার কারণে আপনি শিবিরের ন্যারেটিভ ব্যবহার করেছেন।’’
এ বক্তব্যের পরপরই ঘটনাস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ও অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। ‘‘তাহলে তো বলা যায় ছাত্রদলের হাত ধরে অফিসিয়ালি ৫ আগস্টের পর প্রথম ট্যাগিং রাজনীতি শুরু হলো।’’
গত কয়েক দিন আগেও আমরা দেখেছি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব তাদের একটি সংবাদ সম্মেলনে একজন মেয়েকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন বলতে যে, শিবির একটি রক কাটা দল। কিন্তু মেয়েটি প্রথমেই নার্ভাস হয়ে যায়, সে বলতে শুরু করে, ‘‘এ যে শিবির একটি…’’—তারপর আর কিছু বলতে পারছিল না। তখন রাকিব পাশ থেকে বলে দেন, ‘‘যে রক কাটা দল/গুপ্ত সংগঠন বলতে।’’ যখন মেয়েটি মাইক ছেড়ে দেয়, তখন রাকিব বলেন, ‘‘ভালো করে শিখে আসবা’’ । এত জঘন্য ট্যাগের রাজনীতি আর আগে কেউ কখনো করেনি। ছাত্রদলের ভাইদেরকে সম্মানের সাথে বলব, আপনারা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ট্যাগের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসুন। কারণ এই দেশে এখন আর জারকার নেই, আমি স্বাধীনতা বিরোধীদের ঘৃনা করি, তাই বলে কেউ আপনার মতের বা দলের বিরোধী হলে তাকে রাজাকার বলবেন এটা জেনজি প্রজন্মের কেউ মেনে নেবে না।
পরিষেশে বলব, ট্যাগ রাজনীতি এই দেশে কখনো স্থায়ী হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। জনগণ স্পষ্ট করে দিয়েছে—যে-ই হোক না কেন, ট্যাগের রাজনীতি তারা মেনে নেবে না। এজন্য আমাদের উচিত হবে ট্যাগের রাজনীতি না করে ত্যাগের রাজনীতি করা।
লেখক: সাংবাদিক
মন্তব্য করুন