বৃহস্পতিবার
০৬ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
০৬ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই ২০২৪-এর আত্মত্যাগ এবং আমাদের নাগরিক দায়বদ্ধতা

শাহাদাত হোসেন
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৪ পিএম
এনপিবি গ্রাফিক্স
expand
এনপিবি গ্রাফিক্স

​জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য ও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও সর্বজনীন গণতান্ত্রিক এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বৈরাচারী মনোভাব ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের এ এক ঐতিহাসিক বলিষ্ঠ অবস্থান। কিন্তু আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিদ্যমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই অসামান্য অর্জনের মর্যাদা রক্ষা ও মূল ভাবনার সঠিক বাস্তবায়ন এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

​আইনের শাসন ও 'মব কালচার'-এর সংকট

আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সাম্য ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়া, গণপিটুনি, 'মব জাস্টিস' (Mob Justice) এবং ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আক্রোশ মেটানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাকে সঠিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিচার না করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আন্দোলনের চেতনা ও বৈষম্যহীন সমাজের মূল দর্শনের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

​প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা ও পুনর্বাসনে ধীরগতি

প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলা ও ধীরগতির সংস্কার সাধারণ মানুষের মাঝে হতাশার সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও কর্মক্ষেত্রে যে শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতা আশা করা হয়েছিল, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। পাশাপাশি, আন্দোলনে শহীদদের পরিবারের যথাযথ মূল্যায়ন, আহতদের দ্রুত ও আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং তাদের পুনর্বাসনের গতি আশানুরূপ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।

​অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও জীবনের টানাপোড়েন

অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসানের সাথে সাথে বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ ও দুর্নীতির লাগাম টানার যে তীব্র প্রত্যাশা ছিল, অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পদক্ষেপের অভাবে তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

​জাতীয় ঐক্যের ফাটল ও রাজনৈতিক কৃতিত্বের লড়াই

আন্দোলন চলাকালীন যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল-যেখানে ছাত্র, শ্রমজীবী, সাধারণ নাগরিক ও বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ এক পতাকাতলে এসে দাঁড়িয়েছিল বর্তমানে সেই ঐক্যে চিড় ধরার স্পষ্ট আলামত দেখা যাচ্ছে। আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং পারস্পরিক বিভাজন বিপ্লবের মূল অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে।

​ভবিষ্যৎ পথরেখা ও নাগরিক দায়বদ্ধতা

জুলাই ২০২৪ কোনো একটি নির্দিষ্ট দিন বা মুহূর্তের ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান দর্শন এবং দীর্ঘমেয়াদি আদর্শিক পরিবর্তনের সূচনা। শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আন্দোলনকারীদের রক্ত লালিত স্বপ্নকে কেবল স্মৃতিচারণায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিশৃঙ্খলা, বিভাজন ও সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তায় আটকে থাকলে আমরা জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের উপযুক্ত সম্মান দিতে ব্যর্থ হব।

এই ভুলভ্রান্তিগুলো শুধরে নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের সুনির্দিষ্ট সংস্কার, সহনশীলতা প্রদর্শন, পরমতসহিষ্ণুতা চর্চা এবং নাগরিক হিসেবে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি। তবেই জুলাইয়ের ত্যাগের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা পাবে এবং একটি সত্যিকার অর্থে মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক: সমাজসেবক ও সংগঠক

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন