


বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় উন্মাদনার সৃষ্টি হয়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথরিয়া—সবখানে উড়তে থাকে পছন্দের দলের আকাশছোঁয়া পতাকা, চায়ের কাপে ঝড় ওঠে তর্কের। লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার কোটি কোটি সমর্থক এ দেশে বিদ্যমান। ফুটবলপ্রেমের এই আবেগ নিঃসন্দেহে সুদীর্ঘকালের এবং তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ কয়েকবার প্রশংসিত হয়েছে। বিগত কাতার বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের মানুষের ফুটবলপ্রেম বিশ্ব মিডিয়ার নজর কেড়েছিল।
আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (ফিফা) তাদের অফিসিয়াল হ্যান্ডেলে বাংলাদেশের সমর্থকদের ভিডিও শেয়ার করে সম্মান জানিয়েছিল। এমনকি আর্জেন্টিনা ফুটবল দল ও তাদের সাধারণ সমর্থকেরা বাংলাদেশের এই উন্মাদনাকে সাধুবাদ জানিয়ে বাংলাদেশে তাদের দূতাবাস পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। বিশ্বমঞ্চে একটি দেশের ইতিবাচক ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ক্রীড়া উন্মাদনা কতটা শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, বাংলাদেশ তার অন্যতম বড় উদাহরণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস, শর্টস, টিকটক এবং বিভিন্ন চটকদার ডিজিটাল মিডিয়ার মাইক্রোফোনের সামনে ফুটবল উন্মাদনার নামে যা ঘটছে, তা সাধারণ বিবেকবান, বুদ্ধিজীবী ও সচেতন মহলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভিউ, রিচ বা ‘লাইক-কমেন্ট’ পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন একশ্রেণীর তরুণ-তরুণী। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিস্তারের এই যুগে ‘ভাইরাল’ হওয়াই যেন একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এই উন্মাদনা ও বিনোদনের আড়ালে কিছু অবক্ষয় ও কুরুচিপূর্ণ সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, যা আমাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক শিক্ষা, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক শালীনতা এবং জাতীয় ভাবমূর্তিকে বিশ্বদরবারে মারাত্মকভাবে খাটো করছে। ক্রীড়া সংস্কৃতির যে একটি নিজস্ব পরিশীলিত রূপ রয়েছে, তা কর্পোরেট স্পনসরশিপ ও ভিউ-বাণিজ্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। modern বা আধুনিকতার নামে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা তরুণ সমাজের একটি অংশকে নৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে আমাদের বৃহত্তর সমাজব্যবস্থায়। কোনো সমাজের সংস্কৃতির মূল ভিত্তি যদি কেবল ক্ষণস্থায়ী সস্তা জনপ্রিয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেই সমাজের পতন অবশ্যম্ভাবী।
সাম্প্রতিক সময়ে খেলা বা খেলোয়াড়দের কেন্দ্র করে দেশের কিছু তরুণী ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা প্রকাশ্য ক্যামেরার সামনে অত্যন্ত আপত্তিকর, কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন মন্তব্য করছেন। বিশ্বখ্যাত ফুটবল তারকা নেইমার কিংবা মেসিকে নিয়ে এমন কিছু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা কোনো সুস্থ, শিক্ষিত ও সভ্য সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না। কোনো আন্তর্জাতিক তারকাকে নিয়ে প্রকাশ্য মাধ্যমে ‘কчи মাল’ বলা কিংবা ‘তাকে পেলে বিছানায় বা খাটে নিয়ে যাওয়া’র মতো কুরুচিপূর্ণ, চরম ইঙ্গিতপূর্ণ ও অবমাননাকর কথাবার্তা বলা হচ্ছে। এই ধরণের কথাবার্তা কেবল সস্তা যৌন সুড়সুড়িই তৈরি করে না, বরং একজন মানুষের রুচিবোধ কতটা নিচু স্তরে গিয়ে ঠেকলে তা প্রকাশ্য ক্যামেরার সামনে বলা সম্ভব, সেই প্রশ্নও তোলে। শুধু বক্তব্যই নয়, এর সাথে যুক্ত হয়েছে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি, যা আমাদের সামগ্রিক রুচিবোধ এবং সুস্থ মানসিকতার চরম বিপর্যয়কে নির্দেশ করে। বিনোদন বা স্রেফ ‘মজা’ করার ছলে এই ধরণের ট্রল বা মন্তব্য করা হলেও, এগুলো আসলে আমাদের তরুণ সমাজের একাংশের নৈতিক অবক্ষয়েরই প্রতিচ্ছবি। যখন একজন নারী বা তরুণী প্রকাশ্য মাধ্যমে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণভাবে কোনো পুরুষের শরীর বা বয়স নিয়ে ইঙ্গিত করেন, তখন তা সমাজ ও সংস্কৃতির সামগ্রিক অবক্ষয়ের গভীরতাকে ফুটিয়ে তোলে।
আজকের বিশ্ব গ্লোবালাইজেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। বাংলাদেশে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কোনো মন্তব্য করলে তা নিমেষেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অনুবাদের সহজলভ্যতার কারণে এই ভিডিওগুলো এখন আর শুধু বাংলাভাষী মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। সাবটাইটেল বা অনুবাদের মাধ্যমে বিদেশি সংবাদমাধ্যম বা আন্তর্জাতিক ফুটবল ভক্তদের কাছে যখন এ ধরনের বক্তব্য ও ভিডিও পৌঁছায়, তখন তারা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে নয়, বরং পুরো বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এবং দেশের সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করে। বিদেশি ফুটবলারদের ফ্যান পেজ কিংবা আন্তর্জাতিক ফুটবল কমিউনিটিগুলোতে যখন এই ভিডিওগুলো নিয়ে ট্রল করা হয়, তখন তা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্র ও দেশের ভাবমূর্তির ওপর আঘাত হানে। যা এক বুক গর্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করা প্রবাসী ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য চরম লজ্জাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বিশ্বের বুকে আমরা নিজেদের এক সভ্য ও অতিথিপরায়ণ জাতি হিসেবে তুলে ধরতে চাই, কিন্তু এই ধরণের গুটিকয়েক মানুষের কুরুচিপূর্ণ আচরণ সেই দীর্ঘদিনের সুনামে কালিমা লেপন করে দেয়। এর ফলে বহির্বিশ্বে আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মিডিয়া বা অনলাইন পোর্টালগুলোও এই অবক্ষয়ের পেছনে সমানভাবে দায়ী। মূলধারার অনেক গণমাধ্যমের ডিজিটাল উইং এবং ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলগুলো সস্তা ভিউ পাওয়ার আশায় এই ধরণের অশালীন ইন্টারভিউ বা মন্তব্যগুলোকে বেশি করে হাইলাইট করে। তারা বেছে বেছে এমন তরুণ-তরুণীদের সামনে মাইক্রোফোন ধরেন যারা সস্তা বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে দ্বিধা করেন না। সাংবাদিকতার নূন্যতম এথিক্স বা নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে কেবল ক্লিকবেইট থাম্বনেইল আর চটকদার ক্যাপশন ব্যবহার করে এই কন্টেন্টগুলোকে বুস্ট করা হয়। এর ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর একটি সংস্কৃতি মূলধারায় জায়গা করে নেয়, এবং সাধারণ মানুষও মনে করতে শুরু করে এটাই হয়তো বর্তমানের ট্রেন্ড বা আধুনিকতা। গণমাধ্যমের কাজ ছিল সমাজকে আলো দেখানো, কিন্তু আজ বাণিজ্যিক স্বার্থে তারা অন্ধকারের কন্টেন্ট তৈরিতে মদদ দিচ্ছে। কিন্তু ক্রীড়া উন্মাদনা কখনো অশ্লীলতা, কুরুচি কিংবা অবাধ যৌন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশের সমার্থক হতে পারে না।
উন্মাদনার পাশাপাশি অনেকের পোশাক-আশাক এবং চালচলন নিয়েও সমাজে নানা প্রশ্ন ও আপত্তি উঠেছে। উৎসবের আমেজে পোশাকের একটি বড় ভূমিকা থাকে এবং প্রত্যেকেরই নিজস্ব পোশাকের স্বাধীনতা রয়েছে, তবে যেকোনো উৎসব উদযাপনের ক্ষেত্রে সমাজ, সংস্কৃতি এবং নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা থাকা জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে খেলা দেখার আড়ালে পোশাক ও চালচলনের ক্ষেত্রে যে ধরনের অদ্ভুত অনুকরণ এবং উগ্র আধুনিকতা প্রদর্শন করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা অনেক সময় এ দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও শালীনতাবোধের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। ফুটবল উন্মাদনাকে পুঁজি করে এক ধরনের কৃত্রিম পশ্চিমা সংস্কৃতি বা উগ্র আচরণকে তরুণ সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আধুনিক হওয়ার অর্থ কখনোই নিজের শিকড়, শালীনতা বা সামাজিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দেওয়া নয়। নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা রেখে কোনো জাতি কখনো আন্তর্জাতিক স্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।
আমাদের বুঝতে হবে যে, ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক আইকন। তারা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের রোল মডেল। তাদের কঠোর পরিশ্রম, নিয়মানুবর্তিতা এবং খেলার প্রতি একাগ্রতা থেকে তরুণ প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে। অথচ আমরা তাদের মেধা বা স্কিল নিয়ে আলোচনা না করে, মেতে উঠছি তাদের ব্যক্তিগত জীবন, শরীর এবং বয়স নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কাঁদা ছোঁড়াছুড়িতে। এটি কেবল আমাদের মানসিক দৈন্যতাই প্রকাশ করে না, বরং নতুন প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক গঠনকেও বাধাগ্রস্ত করে। তরুণরা যদি খেলাধুলার মতো একটি পবিত্র ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ ক্ষেত্রকে কেবলই সস্তা বিনোদন এবং যৌন সুড়সুড়ির উপাদান হিসেবে দেখতে শুরু করে, তবে ভবিষ্যতের সমাজ এক গভীর নৈতিক সংকটে পতিত হবে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখন একটি সমাজের বিনোদনের মাধ্যমগুলো কেবল শরীর সর্বস্ব বা সস্তা ট্রল-নির্ভর হয়ে পড়ে, তখন সেই সমাজের সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা স্থবির হয়ে যায়। এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে রাষ্ট্র গঠনের মূল স্তম্ভগুলোর ওপর।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমও এই অপসংস্কৃতিকে উস্কে দিচ্ছে। নেতিবাচক এবং কুরুচিপূর্ণ কন্টেন্টগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বা ভাইরাল হয়, যার ফলে কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা আরও বেশি করে এই ধরনের বক্তব্য দিতে প্রলুব্ধ হচ্ছে। এই যে অবাধ ভিউ এবং অর্থ উপার্জনের নেশা, তা আমাদের চিরন্তন সামাজিক বাঁধনগুলোকে আলগা করে দিচ্ছে। আগে যেখানে বড়দের সামনে কোনো কুরুচিপূর্ণ কথা বলতে মানুষ লজ্জাবোধ করত, আজ সেখানে লাখ লাখ মানুষের সামনে ক্যামেরার মুখে দাঁড়িয়ে অনায়াসে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি সমাজ হিসেবে আমাদের সামগ্রিক পচনের ইঙ্গিত দেয়। এই ভাইরালিটির ফাঁদে পড়ে আমাদের তরুণ সমাজের বড় একটি অংশ নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা ভাবছে যে কোনো উপায়ে লাইমলাইটে আসাই বুঝি জীবনের চরম সার্থকতা, যা এক মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মেধা ও নৈতিকতাহীন এক জনসমষ্টিতে পরিণত হবে।
এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের নেপথ্যে রয়েছে যথাযথ পথপ্রদর্শনের অভাব। ক্রীড়া সাংবাদিকতার যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের দেশে রয়েছে, যেখানে খেলার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সুস্থ বিনোদন পরিবেশন করা হতো, তা আজ একশ্রেণীর ভুঁইফোড় অন-ক্যামেরা রিপোর্টিংয়ের কারণে ম্লান হতে বসেছে। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে তরুণীদের উস্কানিমূলক প্রশ্ন করা এবং সেই উত্তরের রসালো অংশটুকু কেটে টিকটক বা রিলসে আপলোড করা যেন এক নিয়মিত বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে আমরা অবচেতনভাবেই এক ধরণের অবাধ ও বিকৃত রুচিবোধকে প্রশ্রয় দিচ্ছি, যা শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিবার ও সামাজিক কাঠামোর ওপর বড় ধরণের আঘাত হানবে। সুস্থ বিনোদনের জায়গা যখন বিকৃত উল্লাস দখল করে নেয়, তখন সমাজে অপরাধপ্রবণতা এবং নৈতিক স্খলন বৃদ্ধি পায়।
এই সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের এখনই সম্মিলিতভাবে সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো একটি নির্দিষ্ট বিকৃত রুচির গোষ্ঠীর বা কতিপয় ব্যক্তির সস্তা জনপ্রিয়তার দায় পুরো দেশের ১৬ কোটি মানুষ নিতে পারে না। এই পরিস্থিতি রুখতে বহুমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করতে হবে। যুবসমাজকে শালীনতা, ভাষার পরিমিতিবোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তান সোশ্যাল মিডিয়ায় কী দেখছে বা কী ধরণের কন্টেন্ট তৈরি করছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে। পারিবারিক জবাবদিহিতা না থাকলে কোনো আইনি ব্যবস্থা দিয়ে সমাজকে পুরোপুরি সংশোধন করা সম্ভব নয়। একটি সুস্থ পারিবারিক বন্ধনই পারে যুবসমাজকে যেকোনো ধরণের অপসংস্কৃতির হাত থেকে রক্ষা করতে।
দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সস্তা ভিউ ও চটকদার শিরোনামের লোভে যেকোনো অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ সাক্ষাৎকার প্রচার করা থেকে ডিজিটাল ও মূলধারার মিডিয়াগুলোকে বিরত থাকতে হবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং প্রেস কাউন্সিলের পক্ষ থেকে অনলাইন পোর্টালগুলোর জন্য একটি কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, যাতে কেউ ভিউ-বাণিজ্যের জন্য দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে না পারে। সাংবাদিকতাকে অবশ্যই তার নিজস্ব মর্যাদার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে সস্তা লাইক-কমেন্টের চেয়ে জাতীয় স্বার্থ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বড় হয়ে দাঁড়াবে। গণমাধ্যম যদি এই সস্তা সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ না করে, তবে সমাজে সুস্থ ধারার চিন্তাশীল কন্টেন্ট চিরতরে হারিয়ে যাবে এবং সুস্থ রুচির মানুষেরা মিডিয়া বিমুখ হয়ে পড়বেন।
তৃতীয়ত, দেশের সাইবার স্পেসে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে আপত্তিকর, কুরুচিপূর্ণ এবং সংস্কৃতির নামে চরম অবক্ষয়মূলক কনটেন্টগুলোর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যেসকল আইডি বা পেজ থেকে এই ধরণের কুরুচিপূর্ণ ইন্টারভিউ বা কন্টেন্ট ছড়ানো হয়, সেগুলোকে দ্রুত রিপোর্টিংয়ের আওতায় এনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি। শুধু আইন দিয়ে সব বন্ধ করা যাবে না, পাশাপাশি আমাদের সুস্থ কন্টেন্ট তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। ইতিবাচক এবং বিশ্লেষণধর্মী ক্রীড়া আলোচনাকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তরুণরা সঠিক তথ্য ও বিনোদনের স্বাদ পায়। ইন্টারনেটকে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম না বানিয়ে বই পড়া, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও থিয়েটারের মতো মননশীল সাংস্কৃতিক কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি, তরুণ সমাজের জন্য আরও বেশি মাঠপর্যায়ের ক্রীড়া চর্চা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করতে হবে। আজ আমাদের শহরগুলোতে খেলার মাঠের বড্ড অভাব। তরুণেরা মাঠে গিয়ে খেলার সুযোগ না পেয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দি হয়ে পড়ছে এবং সেখান থেকেই এই ধরণের ট্রল সংস্কৃতিতে জড়িয়ে যাচ্ছে। যখন তরুণেরা সরাসরি খেলার মাঠের সাথে যুক্ত থাকবে, তখন তারা ফুটবলারদের খেলার কৌশল, তাদের কঠোর পরিশ্রম ও ডেডিকেশনকে মূল্যায়ন করতে শিখবে। তখন সস্তা ট্রল বা শারীরিক অবয়ব নিয়ে অশালীন মন্তব্য করার মানসিকতা তৈরি হবে না। সুস্থ ক্রীড়া মানসিকতাই পারে অপসংস্কৃতির এই করাল গ্রাস থেকে আমাদের নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে। আমাদের প্রতিটি ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলার ক্লাবগুলোকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, যেখানে জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ শেখানো হয়। শারীরিক কসরত ও খেলাধুলার সুস্থ পরিবেশই পারে তরুণদের মনোযোগ কুরুচিপূর্ণ আসক্তি থেকে সরিয়ে আনতে।
পরিশেষে বলা যায়, স্বাধীনতা মানে কখনোই স্বেচ্ছাচারিতা বা উগ্রতা নয়। পোশাকের স্বাধীনতা কিংবা বাকস্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয় যখন তা অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সামাজিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বিনোদন ক্ষণস্থায়ী কিন্তু দেশের মর্যাদা ও ভাবমূর্তি চিরস্থায়ী। ক্রীড়া উন্মাদনা একটি সুস্থ বিনোদন এবং এটি সমাজকে ইতিবাচক শক্তি যোগায়। কিন্তু সেই বিনোদন যখন সস্তা জনপ্রিয়তা বা ভাইরাল হওয়ার লোভ, অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি ও বিকৃত ভাষা প্রয়োগে রূপ নেয়, তখন তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় অ্যালার্মিং সংকেত। ফুটবল হোক বা যেকোনো বৈশ্বিক আয়োজন, তা আমাদের আনন্দ দিক, উদ্বেলিত করুক এবং বিশ্বের দরবারে আমাদের ফুটবলপ্রেমকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরুক। কিন্তু সেই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ যেন এমন কোনো বিকৃতির জন্ম না দেয়, যা দেখে বিশ্বের বুকে আমাদের মাথা হেট হয়ে যায়। খেলাকে ভালোবাসুন, খেলোয়াড়দের সম্মান করুন এবং ফুটবল উন্মাদনার রঙে রঙিন হোন; কিন্তু নিজের ভাষা, শালীনতা, সংস্কৃতি এবং দেশের মান যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়—এটাই হোক প্রতিটি সচেতন বাংলাদেশির প্রধান অঙ্গীকার ও দায়িত্ব। যদি আজ আমরা এই অপসংস্কৃতির রাশ টেনে ধরতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না। সুস্থ চিন্তা, রুচিশীল বিনোদন এবং স্বকীয় মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমেই কেবল একটি আত্মমর্যাদাশীল ও শক্তিশালী জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের বুকে টিকে থাকতে পারব।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন