


সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ সারোয়ার আলমকে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘটনাটি দেশের প্রশাসনিক অঙ্গন, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসনিক বদলি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া—এ কথা সত্য। কিন্তু কোনো কর্মকর্তার বদলিকে ঘিরে যখন জনমনে এত ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তখন বিষয়টি আর কেবল একটি রুটিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন তা বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা, সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং ক্ষমতার অদৃশ্য বলয়ের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
হাম্মদ সারোয়ার আলম নামটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন নয়। দীর্ঘদিন আগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি আলোচনায় আসেন। ভেজাল খাদ্য, নকল ওষুধ, প্রতারণা, অবৈধ ব্যবসা এবং প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে একজন সাহসী ও আপসহীন কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে তাঁর বিভিন্ন অভিযান মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। অনেকে মনে করেছিলেন, রাষ্ট্রযন্ত্রে এখনও এমন কিছু কর্মকর্তা আছেন, যারা ব্যক্তিগত সুবিধা বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপের কাছে মাথা নত না করে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন।
সিলেটে দায়িত্ব গ্রহণের পরও তিনি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজারকে ঘিরে দানবাক্স ব্যবস্থাপনা এবং অর্থের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়ে জনপরিসরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মাজারে আগত ভক্তরা বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার জায়গা থেকে দান করেন। বছরের পর বছর ধরে বিপুল পরিমাণ অর্থ সেখানে জমা হয়। কিন্তু সেই অর্থের ব্যবস্থাপনা কতটা স্বচ্ছ, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং কতটা আধুনিক আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে—সেই প্রশ্ন বহুদিন ধরেই বিভিন্ন মহলে উত্থাপিত হয়ে আসছিল।
বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ওয়াক্ফ সম্পত্তি, মসজিদ, মাদ্রাসা কিংবা মাজার—এসব প্রতিষ্ঠান মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের কেন্দ্র। এই আস্থা রাষ্ট্রের অন্যতম সামাজিক শক্তি। কিন্তু আস্থার সঙ্গে জবাবদিহি না থাকলে সেখানে প্রশ্ন ওঠে। কারণ মানুষের দেওয়া প্রতিটি টাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশ্বাসের দায়। বিশ্বের বহু মুসলিম দেশেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা এখন আধুনিক অডিট, ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ এবং স্বচ্ছ আর্থিক তদারকির আওতায় আনা হয়েছে। কারণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার জন্যও স্বচ্ছতা অপরিহার্য।
এখানেই মূল প্রশ্নটি উঠে আসে। কোনো কর্মকর্তা যদি জনস্বার্থে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন, তাহলে তাঁকে কি সহযোগিতা করা হবে, নাকি প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে? বাংলাদেশের বাস্তবতা প্রায়ই দ্বিতীয় চিত্রটিই সামনে নিয়ে আসে।
আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সিন্ডিকেট সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেট সবসময় দৃশ্যমান নয়। কখনো তারা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, কখনো রাজনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী, কখনো ভূমিদস্যু চক্র, কখনো ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক, আবার কখনো ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী মহল হিসেবে কাজ করে। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সংগঠিত স্বার্থ। তারা জানে কীভাবে নিজেদের সুবিধা রক্ষা করতে হয়। অন্যদিকে একজন সৎ কর্মকর্তা প্রায়ই একা হয়ে যান। তাঁর হাতে আইন থাকে, কিন্তু সিন্ডিকেটের হাতে থাকে অর্থ, প্রভাব, লবিং, অপপ্রচার এবং নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের কৌশল।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বহু কর্মকর্তা সততা ও পেশাগত নিষ্ঠার কারণে জনসমর্থন পেয়েছেন, কিন্তু একই সঙ্গে নানা প্রতিকূলতারও মুখোমুখি হয়েছেন। কখনো আকস্মিক বদলি, কখনো পদায়নবিহীন অবস্থান, কখনো প্রশাসনিক নিস্ক্রিয়তা, আবার কখনো নানা ধরনের অপ্রকাশ্য চাপ—এসব অভিযোগ নতুন নয়। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ধারণা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে যে, অতিরিক্ত সক্রিয়তা বা আপসহীনতা অনেক সময় পেশাগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ বাস্তবতা একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো আইনের সমান প্রয়োগ। যদি একজন কর্মকর্তা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে নিজেই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান, তাহলে অন্য কর্মকর্তাদের কাছেও ভুল বার্তা পৌঁছে যায়। তারা ভাবতে শুরু করেন—নিয়ম মেনে চলার চেয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে আপস করে চলাই হয়তো নিরাপদ।
এর ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। কারণ দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য রাষ্ট্রের যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে, সেগুলোর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাহস, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তাবোধের ওপর।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধর্মীয় আবেগের অপব্যবহার। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। ধর্মীয় বিষয়ে তাদের আবেগ ও শ্রদ্ধা গভীর। কিন্তু ইতিহাস বলে, বহু ক্ষেত্রে এই আবেগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাব চাওয়া মানে সেই প্রতিষ্ঠান বা ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা মানে প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করা।
একটি মাজার, মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোথা থেকে আসছে, কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এই তথ্য জনসমক্ষে থাকা উচিত। এতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা কমে না, বরং বৃদ্ধি পায়। কারণ স্বচ্ছতা আস্থা তৈরি করে, আর গোপনীয়তা সন্দেহ সৃষ্টি করে।
সারোয়ার আলমকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনগণের প্রতিক্রিয়া। সাধারণত প্রশাসনিক বদলি নিয়ে জনমনে খুব বেশি আগ্রহ দেখা যায় না। কিন্তু এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এর কারণ ব্যক্তি সারোয়ার আলম নন; বরং তাঁর মধ্যে মানুষ একজন সৎ ও কার্যকর কর্মকর্তার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছেন। জনগণের এই প্রতিক্রিয়া আসলে রাষ্ট্রের প্রতি একটি বার্তা—মানুষ এখনও সততা, সাহস এবং জবাবদিহিকে মূল্য দেয়।
রাষ্ট্রেরও উচিত এই বার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা। কারণ একটি দেশ কেবল অবকাঠামো, সেতু, সড়ক কিংবা ভবন দিয়ে এগিয়ে যায় না। একটি দেশ এগিয়ে যায় তখনই, যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়, আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয় এবং সৎ মানুষরা নিজেদের নিরাপদ মনে করেন।
আজকের বাংলাদেশে উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথা হয়। অর্থনীতি, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতির কথা বলা হয়। কিন্তু সুশাসন ছাড়া কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। আর সুশাসনের প্রাণ হলো জবাবদিহি। যেখানে কোটি কোটি টাকার আর্থিক প্রবাহ থাকবে, সেখানে প্রশ্ন থাকবে; যেখানে জনস্বার্থ জড়িত থাকবে, সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে; এবং যেখানে একজন কর্মকর্তা আইন ও নিয়ম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন, সেখানে তাঁকে একা ফেলে দেওয়া যাবে না।
সিলেটের সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই কোনো একক কর্মকর্তার বদলির গল্প নয়। এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং সমাজের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে—আমরা কি সত্যিই একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে চাই, নাকি অদৃশ্য স্বার্থগোষ্ঠীর চাপের কাছে বারবার নতি স্বীকার করব?
একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার সৎ মানুষদের অবস্থান দিয়ে। যদি সততা বারবার শাস্তি পায় এবং আপসকামিতা পুরস্কৃত হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সৎ থাকার প্রেরণা কমে যাবে। কিন্তু যদি সৎ কর্মকর্তারা রাষ্ট্রের নৈতিক সমর্থন, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা এবং জনগণের আস্থা পান, তবে তারাই হয়ে উঠবেন সুশাসনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
সারোয়ার আলমের বদলিকে ঘিরে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটি ব্যক্তি বা পদ নয়—মূলত রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে আলোচনা। সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি সহজ প্রশ্ন: এই দেশে কি এখনও সততা ও স্বচ্ছতার পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব? দেশের মানুষ সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের সুশাসনের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে।
লেখক: জাহিদ ইকবাল
সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।