


"The Cream of UN Peacekeepers" - ২০০৮ সালে বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম বিবিসি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের এই বিশেষায়িত অভিধায় ভূষিত করেছিল। কেবল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমই নয়, আজ সমগ্র বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নীল হেলমেট পরিধানকারী শান্তিরক্ষীরা পেশাদারিত্ব, মানবিকতা এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক। সংঘাত, সহিংসতা ও মানবিক সংকটে বিপর্যস্ত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের বীর সন্তানেরা যেভাবে নিজেদের জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন, তা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য পরম গৌরব ও মর্যাদার।
গৌরবময় যাত্রার ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থানঃ ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক গ্রুপ (UNIIMOG) মিশনে মাত্র ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক প্রেরণের মাধ্যমে জাতিসংঘের ছায়াতলে বাংলাদেশের যে ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ ২০২৬ সালে এসে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে। বিগত প্রায় চার দশকে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৩টি দেশের ৬৩টি সফল মিশনে অত্যন্ত সুনামের সাথে অংশগ্রহণ করেছে।
শুরু থেকে এ পর্যন্ত আমাদের সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী) এবং পুলিশ বাহিনীর ২,০৬,০০০ জনেরও বেশি সদস্য এই বৈশ্বিক শান্তি প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত হয়েছেন। ২০২৬ সালের সর্বশেষ হালনাগাদকৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে জাতিসংঘে সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশের তালিকায় শীর্ষ সারিতে (বর্তমানে ৪র্থ অবস্থানে) রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ১০টি সক্রিয় মিশনে প্রায় ৫,৮৬০ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতাঃ আধুনিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণ আজ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণ প্রায় ১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। হাইতিতে প্রথম অল-ফিমেল মুসলিম পুলিশ ইউনিট মোতায়েন করে বাংলাদেশ যে ইতিহাস গড়েছিল, তা আন্তর্জাতিক শান্তি কূটনীতিতে বাংলাদেশের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকৃত।
রক্তের অক্ষরে লেখা আত্মত্যাগের মহিমান্বিত পরিসংখ্যানঃ বিশ্বের চরম ঝুঁকিপূর্ণ, যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং সংঘাতপ্রবণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ব্যাপক ও চরম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত সর্বমোট "১৭৫ জন" বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কর্তব্যরত অবস্থায় বিশ্বশান্তির জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। অতি সাম্প্রতিক ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সুদানসহ অন্যান্য মিশনে হতাহতদের যুক্ত করে শহীদের এই সংখ্যা ১৭৫-এ পৌঁছেছে। এছাড়া ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ, অতর্কিত হামলা ও দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন "২৭২ জনেরও বেশি" সদস্য। নীচে বাহিনীভিত্তিক হতাহতের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
| বাহিনীর নাম | জীবন দান (শহীদ) | গুরুতর আহত ও পঙ্গু |
ইতিহাসের ট্র্যাজেডি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিঃ এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ কিছু বড় ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছে। ২০০৩ সালের ২৫শে ডিসেম্বর পশ্চিম আফ্রিকার বেনিনে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় ১৫ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কর্মকর্তা ও সদস্য একসাথে নিহত হন, যা আমাদের শান্তিরক্ষা ইতিহাসের অন্যতম বড় বেদনার দিন। একইভাবে ২০০৫ সালে কঙ্গোয় (MONUSCO) জাতিসংঘ কাফেলার ওপর বিদ্রোহীদের নির্মম অতর্কিত হামলায় ৯ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী একযোগে শাহাদাত বরণ করেন।
বাংলাদেশের এই বীরত্বপূর্ণ ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ নিহত শান্তিরক্ষীদের মরণোত্তর জাতিসংঘের মর্যাদাপূর্ণ 'দাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল' (Dag Hammarskjöld Medal) প্রদান করা হয়েছে।
আস্থার প্রতীক: সীমানা ছাড়িয়ে হৃদয়ের বন্ধনঃ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা কেবল সীমান্ত বা নিরাপত্তা রক্ষাই করেন না, বরং আফ্রিকার সিয়েরা লিওন, কঙ্গো, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ সুদানের মতো দেশে রাস্তাঘাট নির্মাণ, ফ্রি চিকিৎসা সেবা এবং মানবিক সাহায্য বিতরণের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে "আস্থার প্রতীক" হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন। এই মানবিক বন্ধনের গভীরতা এতই বেশি যে, সিয়েরা লিওন সরকার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাদের অন্যতম রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে 'বাংলা'-কে সম্মানসূচক মর্যাদা দিয়েছে, যা বাংলা ভাষার বৈশ্বিক প্রসারে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
১০ জুন: আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবসের প্রত্যয়ঃ আজ ১০ জুন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস। আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা দিবস উপলক্ষে বিশ্বের সকল শান্তিরক্ষীর প্রতি রইলো আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও গভীর শ্রদ্ধা। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেসব সাহসী শান্তিরক্ষী তাদের মূল্যবান জীবন উৎসর্গ করেছেন, আজ তাদের আত্মার মাগফেরাত ও পরম শান্তি কামনা করছি। তাদের এই মহিমান্বিত আত্মত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একই সঙ্গে আহত, ক্ষতিগ্রস্ত শান্তিরক্ষী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা।
আমাদের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় দিয়ে দেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন। তাদের এই দায়িত্বশীল ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও সহনশীলতার ভিত্তিতে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব। আর সেই শান্তিপূর্ণ বিশ্ব বিনির্মাণের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ তার সর্বোচ্চ ত্যাগ ও পেশাদারিত্ব নিয়ে বিশ্বমঞ্চে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাবে- আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে এটাই আমাদের অঙ্গীকার। লেখক: প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, ভাইস চ্যান্সেলর, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।