

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, শাসনতান্ত্রিক অনুক্রম এবং প্রশাসনিক গাম্ভীর্যের দৃশ্যমান বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার রাষ্ট্রাচার বা প্রটোকল (State Protocol) কাঠামোর মাধ্যমে। রাষ্ট্রাচার কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো রীতি বা শিষ্টাচার নয়; এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা বিন্যাস ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রতীকী রূপ। পুলিশ সপ্তাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে স্যালুট গ্রহণ বা অভিবাদন মঞ্চে সরকারপ্রধানের সমান্তরালে অন্য ব্যক্তিবর্গের অবস্থান গ্রহণ প্রশাসনিক বিজ্ঞান, সামরিক-বেসামরিক প্রটোকল এবং রাষ্ট্রাচারের মৌলিক নীতিমালার আলোকে গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সাংবিধানিক অনুক্রম ও স্যালুটিং ডেক প্রটোকল (Saluting Deck Protocol)
সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় 'মাননীয় প্রধানমন্ত্রী' হলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ও শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দু এবং চিফ এক্সিকিউটিভ (Chief Executive)। রাষ্ট্রাচার এবং সামরিক-বেসামরিক কুচকাওয়াজের সুনির্দিষ্ট নিয়ম (Ceremonial Protocol) অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় স্যালুট গ্রহণের মূল মঞ্চে বা ডেক-এ সরকারপ্রধান এককভাবে অগ্রভাগে অবস্থান করবেন। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ তাঁর ঠিক পেছনে (In the Rear) নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াবেন। প্রধানমন্ত্রীর সমান্তরালে বা একই লাইনে অবস্থান নেওয়া 'এক্সিকিউটিভ প্রিমাসি' বা নির্বাহী শ্রেষ্ঠত্বের নীতিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীকীবাদ (Institutional Symbolism) ও ক্ষমতার অনুক্রম
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, রাষ্ট্রীয় মঞ্চে ব্যক্তিবর্গের শারীরিক অবস্থান বা 'স্পেশিয়াল অ্যারেঞ্জমেন্ট' (Spatial Arrangement) ক্ষমতার একটি সুনির্দিষ্ট চেইন অব কমান্ড প্রকাশ করে। প্রধানমন্ত্রী পদটি কোনো একক ব্যক্তির পরিচয় নয়, এটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সমান্তরালে অন্যদের অবস্থান গ্রহণ 'প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীকীবাদ'কে বিভ্রান্ত করে। এটি দেখার পর জনমনে এবং প্রশাসনিক স্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য ও চেইন অব কমান্ড নিয়ে একটি ভুল বার্তা পৌঁছাতে পারে, যা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্য মোটেও কাম্য নয়।
জবাবদিহিতা ও কাঠামোগত অবক্ষয় (Structural Decay)
রাষ্ট্রীয় স্যালুট গ্রহণের মতো সংবেদনশীল ও আনুষ্ঠানিক মঞ্চে এই ধরনের দৃশ্যমান ব্যত্যয় প্রটোকল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতা এবং দূরদর্শিতার অভাবকে নির্দেশ করে। একে সাধারণ ভুল হিসেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। নিয়মের এই ধারাবাহিক বিচ্যুতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা একপর্যায়ে 'সাংবিধানিক রাষ্ট্রাচার কাঠামো'র (Constitutional Protocol Framework) প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় বা ধস ডেকে আনতে পারে।
একটি সুশাসিত রাষ্ট্রে যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, ঐতিহ্য এবং প্রটোকলের কঠোর নিয়ম সমুন্নত রাখা অপরিহার্য। উদ্ভূত এই সমান্তরাল অবস্থান গ্রহণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনিচ্ছাকৃত অজ্ঞতা, নাকি পদ্ধতিগত ত্রুটি- তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের অনন্য সম্মান ও গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো আনুষ্ঠানিকতায় এর পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট প্রটোকল কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা সময়ের দাবি। সময় থাকতেই এই প্রশাসনিক বিচ্যুতি সংশোধন করা না হলে, তা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলবে।
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, রাজনীতি বিশ্লেষক