


মানুষের মেধা তার সবচেয়ে বড় সম্পদ—কিন্তু এই মেধার প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় তার প্রয়োগের মাধ্যমে।
কেবল মস্তিষ্কের মধ্যে তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হলেই প্রকৃত মেধাবী হওয়া যায় না; বরং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে ন্যায় ও অন্যায়ের সীমারেখা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার সক্ষমতা অর্জন করা হলো মেধার আসল সার্থকতা।
অনেকেই তাদের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন শুধু ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য। কেউ কেউ যুক্তির মারপ্যাঁচে সত্যকে আড়াল করে অন্যায়কে ন্যায়ের মোড়কে উপস্থাপন করেন।
এ ধরনের বুদ্ধিমত্তা যতই চমকপ্রদ হোক না কেন, তা প্রকৃত মেধার পরিচায়ক নয়। কারণ, বিবেকহীন বুদ্ধিমত্তা শেষ পর্যন্ত সমাজে বিভ্রান্তি, অবিচার ও অস্থিরতার জন্ম দেয়।
প্রকৃত মেধাবী ব্যক্তি তিনি, যিনি নিজের জ্ঞান ও বুদ্ধিকে মানবকল্যাণে নিয়োজিত করেন। তিনি সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে ভয় পান না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দ্বিধা করেন না। তার কাছে মেধা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির হাতিয়ার নয়; বরং তা সমাজের উন্নয়ন ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
বিবেক
বিবেক এখানে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। বিবেক মানুষকে সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখায়, মেধাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। মেধা যদি হয় শক্তি, তবে বিবেক তার দিকনির্দেশনা। এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া প্রকৃত প্রজ্ঞার জন্ম হয় না।
মেধার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত আছে সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এবং ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার মধ্যে। যে মেধা এই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাকে প্রকৃত মেধা হিসেবে গণ্য করা যায় না। সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন এমন মেধাবী মানুষের, যারা কেবল বুদ্ধিমান নন—বরং ন্যায়পরায়ণ, বিবেকবান এবং সত্যনিষ্ঠ।
জ্ঞানপাপী
মেধা তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানবতার কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। অন্যথায়, তা রূপান্তরিত হয় মানবতাবিরোধী ক্ষমতায়, যা কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি ডেকে আনে। এদের বলে "জ্ঞানপাপী” বা জ্ঞান অর্জন করে পাপ করে বেড়ায়।
ক্রিস্টোফার মার্লো (Christopher Marlowe) তার বিখ্যাত নাটক ডক্টর ফস্টাস (Doctor Faustus)-এ “জ্ঞানপাপী” বা জ্ঞানের অপব্যবহারকারীদের গভীরভাবে উপস্থাপন করেছেন। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডক্টর ফস্টাস একজন অসাধারণ পণ্ডিত ছিলেন, যিনি প্রচলিত জ্ঞানে সন্তুষ্ট থাকতে চাননি।
তিনি চেয়েছিলেন আরো বেশি ক্ষমতা, জ্ঞান, নারী ও সম্পদ । এগুলো পাওয়ার লোভে অতিপ্রাকৃত শক্তি ( যাদু বিদ্যা) অর্জনের জন্য শয়তানের (লুসিফার) প্রতিনিধি মেফিস্টোফিলিসের সঙ্গে ২৪ (চব্বিশ) বছরের জন্য নিজের আঙ্গুল কেটে রক্ত বের করে তা দিয়ে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির শর্ত ছিল এই সময়ের জন্য ফস্টাস অতিমানবীয় ক্ষমতা ও জ্ঞান লাভ করবেন এবং মেফিস্টোফিলিস তার দাস হিসেবে থাকবে।
এর বিনিময়ে ২৪ বছর পর ফস্টাস তার আত্মা শয়তানের কাছে সমর্পণ করবেন এবং নরকে যাবেন ।
নাটকটিতে দেখা যায়, এই ২৪ বছর ফস্টাস জাদুকরী ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও তুচ্ছ কাজ করেন এবং অবশেষে সময় শেষ হলে শয়তানেরা তার আত্মাকে নরকে নিয়ে যায় ।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যায়
ফস্টাস বুঝতে পারেনি যে সময় এত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। তাই নরকে যাওয়ার মুহূর্তে ফস্টাস আরো বেঁচে থাকার আশায় এবং নরকের যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আর্তনাদ করতে থাকে এবং বিভিন্ন সংলাপ আওড়াতে থাকে । সবশেষে তিনি উচ্চস্বরে বলে ওঠেন : "ওহ ক্রাইষ্ট" । এটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে শয়তান তাকে বধ করে।
নাট্যকার মার্লো দেখিয়েছেন—শুধু জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়; সেই জ্ঞানের নৈতিক ব্যবহারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফস্টাস মূলত “জ্ঞানপাপী”-এর প্রতীক। কারণ— তিনি জ্ঞানকে মানবকল্যাণে ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও ভোগের জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।
নৈতিক সীমারেখা অতিক্রম করেন ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝেও ভুল পথ বেছে নেন।
মার্লোর এই নাটকটি রেনেসাঁ যুগের এক বড় দ্বন্দ্বকে তুলে ধরে—অসীম জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বনাম ধর্মীয় ও নৈতিক সীমাবদ্ধতা।
ফস্টাসের ট্র্যাজেডি আসলে এই বার্তাই দেয়: বিবেকহীন জ্ঞান মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
জ্ঞানপাপীদের বিচরণ সর্বক্ষেত্রে
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় সংসদের স্পিকার ডক্টর শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করার পর তার মেধার কথা বলা হচ্ছে। তিনি সব স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি জ্ঞানী তাই তাকে গ্রেফতার করা ঠিক হয়নি।
একজন ব্যক্তির যদি এতই মেধা থাকে তাহলে তিনি ন্যায় ও অন্যায়ের সীমারেখা চিহ্নিত করতে পারেননি কেন, ফ্যাসিস্টের দোসর হয়ে অবৈধ পার্লামেন্টের স্পিকার হলেন কেন? তার বিবেক সায় দিল কিভাবে? একবার হয়তো ভুল হতে পারে, কিন্তু বারবার অবৈধ সংসদের স্পিকার হয়ে কিভাবে গণতন্ত্র হত্যার কাজে শরীক হলেন। নিশ্চয়ই ব্যক্তিগত লাভ এবং লোভের বশবর্তী হয়ে ডক্টর ফস্টাসের মতো নিজের বিবেককে বিসর্জন দিয়েছিলেন।
বিভিন্ন সরকারের মধ্যে ডক্টর ফস্টাসের মতো অনেক জ্ঞানপাপী থাকে। তারা সুন্দর কথা বলে, কুটকৌশলের আশ্রয় নেয় এবং মিথ্যাকে সত্যি বলে চালিয়ে দিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থের বাইরে অবস্থান নিয়ে নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করে।
তাই মেধা তখনই মহৎ হয়ে ওঠে, যখন তা সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, দেশ ও জনগণের স্বার্থে কাজ করে, অন্যথায়, সেই মেধাই মানুষকে জ্ঞানপাপের অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিতে পারে।
লেখক: সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেজর (অব.) মনজুর কাদের।
মন্তব্য করুন