সোমবার
০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​বৈশ্বিক আগ্নেয়গিরির মুখে ছোট এক ব-দ্বীপ

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম
এআই দিয়ে তৈরি ছবি
expand
এআই দিয়ে তৈরি ছবি

​বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি যেন এক অশান্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪-২৫ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতা কমেনি; বরং ইরান-আমেরিকা সরাসরি সংঘাতের প্রেক্ষাপট মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। লোহিত সাগর থেকে শুরু করে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের প্রধান বাণিজ্য পথগুলো এখন রণক্ষেত্র। এর ফলে জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং খাদ্যশস্যের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) প্রায় ধ্বংসের মুখে।

​আমদানি নির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। মুদ্রাস্ফীতির পারদ যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় এক টেবিলে বসতে পারবে? উন্নত বিশ্বে যখন জাতীয় বিপর্যয়ে ‘দ্বি-পক্ষীয় সমর্থন’ দেখা যায়, বাংলাদেশে কি সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদয় হবে? ​ ​রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট কেবল সরকারের একার পক্ষে সামাল দেওয়া অসম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশল।

​বর্তমানে সাধারণ মানুষের প্রধান শত্রু কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্য। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও অভ্যন্তরীণ ‘বাজার সিন্ডিকেট’ সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে, কেবল রাজপথে বিক্ষোভ না করে বিরোধী দলগুলো ছায়া মন্ত্রিসভা বা বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে বিকল্প বাজার ব্যবস্থাপনা প্রস্তাব করতে পারে। ​ সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে জেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং কমিটি গঠন করা গেলে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব।

​মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার ফলে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার ছাড়ানোর উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য এনার্জি ডিপ্লোম্যাসি বা জ্বালানি কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা (IMF, World Bank) এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে আলোচনার সময় যদি দেশের সব রাজনৈতিক দল অভিন্ন স্বরে কথা বলে, তবে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

​বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংকটের সময় একে অপরকে দায়ী করার সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। কিন্তু বর্তমানের পলিসাইক্রাইসিস' বা বহুমুখী সংকট এই বিলাসিতার সুযোগ দিচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচিত বিরোধী মতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং বিরোধী দলের উচিত কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে যৌক্তিক বিকল্প তুলে ধরা। একেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'Constructive Opposition' বা গঠনমূলক বিরোধী দল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষকদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন দলীয় পতাকা নয়, বরং জাতীয় পতাকাই হওয়া উচিত প্রধান পরিচয়। আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা যেমন যুদ্ধকালীন সময়ে এক হয়ে যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকেও সেই ‘ম্যাচিউরিটি’ বা পরিপক্কতা দেখাতে হবে। অন্যথায়, বৈশ্বিক এই ঝড় আমাদের উন্নয়নের ভিত্তিকে ধসিয়ে দিতে পারে।

​বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন এবং অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে রাজনৈতিক বিভাজন এখন বিলাসিতা মাত্র। ২০২৬ সালের এই বৈশ্বিক অস্থিরতা আমাদের সামনে একটি চরম সত্যকে উন্মোচন করেছে সংকট ব্যক্তিগত বা দলীয় নয়, এটি জাতীয়। সাধারণ মানুষ এখন রাজপথের সংঘাত চায় না; তারা চায় সমাধান।

রাজনৈতিক দলগুলো যদি ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারে, তবেই বাংলাদেশ এই ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহামন্দার হাত থেকে রক্ষা পাবে। সময়ের দাবি একটাই রাজনীতি হোক মানুষের জন্য, দেশের জন্য।

লেখক: মোঃ মিলন, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন