রবিবার
০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
রবিবার
০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা ও বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা

মো. মিলন
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

​ইরান ও আমেরিকার মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিশ্ব এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি।

বর্তমানে এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২০% এবং এলএনজি (LNG) সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয়।

এই রুটটি দীর্ঘমেয়াদী বন্ধ থাকলে আধুনিক সভ্যতার চাকা থমকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।

​২০২৬ সালের বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ছোট-বড় প্রায় ৩২টি সক্রিয় সশস্ত্র সংঘর্ষ ও যুদ্ধ চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারকারী

যুদ্ধগুলো হলো:

​ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকা উত্তেজনা: মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

​রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: যা দীর্ঘ চার বছর ধরে ইউরোপ ও বিশ্বের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থির করে রেখেছে।

​সুদান গৃহযুদ্ধ: আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ মানবিক বিপর্যয়।

​মিয়ানমার গৃহযুদ্ধ: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা ঝুঁকি।

গাজা ও লেবানন সংকট: যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ ও দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের পরিণতি

​যদি ইরান ও আমেরিকার যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং হরমুজ প্রণালী পূর্ণাঙ্গভাবে বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব নিম্নোক্ত ক্ষতির সম্মুখীন হবে:

​জ্বালানি তেলের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি: জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ থেকে ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

​বৈশ্বিক পরিবহন ও লজিস্টিক বিপর্যয়: জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়বে, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হবে।

​খাদ্য সংকট: কৃষি উৎপাদন ও সার পরিবহনে জ্বালানি অপরিহার্য। এর অভাবে বিশ্বে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

​উন্নয়নশীল দেশের দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি: আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত ফুরিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান ও গৃহীত পদক্ষেপ

​বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এই সংকটকে 'জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি' হিসেবে বিবেচনা করছে। অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে জনগণের উদ্দেশ্যে যুদ্ধের বার্তা ও সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন:

​জ্বালানি সাশ্রয় (Austerity Measures): সরকার দেশজুড়ে জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতা সাধনের ঘোষণা দিয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়িতে তেল ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ (রেশনিং) এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

​বিকল্প উৎস খোঁজা: কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে এবং অন্যান্য দেশ থেকে বিকল্প উপায়ে তেল আমদানির আলোচনা চলছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও মজুদ: সরকার খাদ্য সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে খাদ্যশস্য মজুদ করছে এবং সার উৎপাদন সচল রাখতে ৫টি সার কারখানার মধ্যে ৪টি বন্ধ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা: শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন সচল রাখতে আবাসিক এলাকায় পরিকল্পিত লোডশেডিং এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ​ সরকারের পক্ষ থেকে বার্তা ও আমলাদের বক্তব্য

​সরকারের নীতি-নির্ধারক ও আমলারা জানিয়েছেন যে, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং বাংলাদেশের একার পক্ষে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাদের মূল বার্তা হলো:

​আমরা সাশ্রয়ী না হলে দেশ অচল হয়ে যেতে পারে। সরকার ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে অভ্যন্তরীণ বাজারেও দাম সমন্বয় করা ছাড়া উপায় থাকবে না।" ​ ​বিশ্ব এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর আঁচ থেকে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো রক্ষা পাওয়া কঠিন হবে।

তবে বর্তমান সরকার যদি কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অভ্যন্তরীণ সাশ্রয় নীতি কঠোরভাবে পালন করতে পারে, তবে এই মহাবিপর্যয় কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব।

​তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA), রয়টার্স, বিএসএস (BSS) এবং বৈশ্বিক সংবাদ মাধ্যম।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন