


বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত গত দুই দশকে অভূতপূর্ব সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে গেছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষাকে সহজলভ্য করার মাধ্যমে দেশ একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু এই আশাবাদের ভেতরেই ধীরে ধীরে একটি গভীর সংকট দৃশ্যমান হয়েছে—শিক্ষিত বেকারত্ব এবং দক্ষতার ঘাটতি। একদিকে বিপুল সংখ্যক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণী, অন্যদিকে শিল্পখাতের অভিযোগ—“দক্ষ জনশক্তি পাওয়া যাচ্ছে না।” এই বৈপরীত্য কেবল একটি সামাজিক বা শিক্ষাগত সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি কাঠামোগত সংকট।
এই বাস্তবতা বোঝার জন্য পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো জরুরি। Bangladesh Bureau of Statistics–এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ থেকে ২৭ লাখ। তবে এই সংখ্যার ভেতরে যে চিত্রটি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক, তা হলো শিক্ষিত তরুণদের অবস্থান। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১০%–১২%, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ, শিক্ষার পরিমাণ বাড়লেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বাড়ছে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
এই অনিশ্চয়তা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩০% থেকে ৪০% গ্র্যাজুয়েট প্রথম এক থেকে দুই বছরের মধ্যে স্থায়ী বা উপযুক্ত চাকরি পায় না। এই সময়টাতে অনেকেই অস্থায়ী কাজ করে, আবার অনেকে পুরোপুরি বেকার থাকে। ফলে তাদের ক্যারিয়ারের শুরুতেই একটি বড় ধরনের ফাঁক তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের পেশাগত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
অন্যদিকে, শ্রমবাজারের চাহিদার দিকে তাকালে ভিন্ন একটি চিত্র পাওয়া যায়। International Labour Organization–সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের শ্রমবাজারে একটি বড় ধরনের “skill mismatch” বিদ্যমান। অর্থাৎ, চাকরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে সেই পদগুলো পূরণ করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০% থেকে ৭০% নিয়োগদাতা দক্ষ কর্মী খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছেন। একই সঙ্গে প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান মনে করে, চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
এই দুই বাস্তবতা—একদিকে বেকার শিক্ষিত তরুণ, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর অভাব—একটি মৌলিক অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে: কেন এই বিচ্ছিন্নতা? কেন একজন উচ্চ সিজিপিএধারী শিক্ষার্থীও কর্মক্ষেত্রে অপ্রস্তুত থেকে যাচ্ছে?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোর দিকে তাকাতে হয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাভিত্তিক এবং সিজিপিএ-কেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীদের সাফল্য মূলত নির্ধারিত হয় তাদের পরীক্ষার ফলাফল দ্বারা। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি প্রস্তুতি নেয়, যা পরীক্ষায় ভালো ফল নিশ্চিত করে, কিন্তু বাস্তব জীবনের দক্ষতা গড়ে তোলে না। এই প্রক্রিয়ায় তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জিত হলেও বাস্তব প্রয়োগের সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে তৈরি হয় না।
ফলাফল হিসেবে আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা বইয়ের ভাষায় দক্ষ, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের ভাষায় নয়। তারা ধারণা বোঝে, কিন্তু প্রয়োগ করতে পারে না; তারা উত্তর লিখতে পারে, কিন্তু সমস্যা সমাধান করতে পারে না; তারা সিজিপিএ অর্জন করে, কিন্তু পেশাগত দক্ষতার জায়গায় পিছিয়ে থাকে। বিশেষ করে যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং পেশাগত আচরণের মতো বিষয়গুলো—যা আধুনিক কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষা ব্যবস্থায় যথাযথভাবে গুরুত্ব পায় না।
এই সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে যখন আমরা বৈশ্বিক শ্রমবাজারের পরিবর্তনের দিকে তাকাই। World Economic Forum–এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বর্তমান অনেক চাকরির ধরন বদলে যাবে, এবং নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে। বিশেষ করে critical thinking, problem-solving, digital literacy এবং adaptability—এই দক্ষতাগুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো এই দক্ষতাগুলোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রস্তুত নয়।
ডিজিটাল দক্ষতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেক শিক্ষার্থীরই প্রাথমিক পর্যায়ের প্রযুক্তিগত দক্ষতা—যেমন ডেটা বিশ্লেষণ, প্রেজেন্টেশন টুল ব্যবহার, বা আধুনিক সফটওয়্যার পরিচালনা—পর্যাপ্ত নয়। ফলে তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের পর নতুন করে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।
এই পুরো সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে একাডেমিয়া এবং ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে জ্ঞান ও দক্ষতা শেখানো হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ৩০% থেকে ৪০% ক্ষেত্রে কারিকুলাম উন্নয়নে শিল্পখাতের কোনো প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা যে জ্ঞান অর্জন করে, তা অনেক সময়ই বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য হয় না।
ইন্টার্নশিপ বা শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগের যে সীমিত সুযোগ রয়েছে, তাও অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। শিক্ষার্থীরা প্রকৃত অর্থে কোনো দায়িত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায় না। ফলে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
অন্যদিকে, শিল্পখাতও অনেক সময় এই ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে না। তারা প্রস্তুত দক্ষ কর্মী খুঁজে, কিন্তু সেই দক্ষতা তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে আগ্রহী হয় না। এই দ্বিমুখী অনাগ্রহের ফলে একাডেমিয়া এবং ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে একটি স্থায়ী দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক নয়; এর একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। যখন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বেকার থাকে বা তাদের দক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে যুক্ত থাকে, তখন দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কমে যায়। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি একটি নেতিবাচক সংকেত দেয়—কারণ দক্ষ মানবসম্পদের অভাব একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক সুবিধার মধ্যে রয়েছে, যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সর্বাধিক। এই “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” যদি দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা যায়, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতিকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি এই জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে এটি একটি অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
এই প্রেক্ষাপটে একাডেমিয়া–ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন একটি অত্যাবশ্যক সমাধান হিসেবে সামনে আসে। শিক্ষা এবং শিল্পখাতের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরি করা গেলে শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনার সময়ই বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে। তারা বুঝতে পারবে কর্মক্ষেত্রে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে। একই সঙ্গে শিল্পখাতও তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবে।
এই কোলাবোরেশন শুধু ইন্টার্নশিপ বা অতিথি বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এটি হতে হবে একটি কাঠামোগত এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব, যেখানে কারিকুলাম প্রণয়ন, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে শিল্পখাতের অংশগ্রহণ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে হতে হবে আরও নমনীয় এবং বাস্তবমুখী, আর শিল্পখাতকে হতে হবে আরও দায়িত্বশীল এবং অংশগ্রহণমূলক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। আমাদের বুঝতে হবে যে, সিজিপিএ কোনো শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতার প্রতিফলন নয়। এটি একটি সূচক মাত্র। একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ হয় তার জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ের মাধ্যমে। এই সমন্বয় তৈরি করতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর—আমরা কি কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী একটি শিক্ষা ব্যবস্থা ধরে রাখব, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করব, যা দক্ষ, সৃজনশীল এবং কর্মমুখী মানবসম্পদ গড়ে তুলবে। যদি আমরা দ্বিতীয় পথটি বেছে নিতে চাই, তাহলে একাডেমিয়া এবং ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
কারণ শেষ পর্যন্ত, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু তার অবকাঠামো বা বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে তার মানুষের দক্ষতার ওপর। আর সেই দক্ষতা তৈরি করার দায়িত্ব শিক্ষা ব্যবস্থার, যা একা নয়—শিল্পখাতের সঙ্গে মিলেই তা সম্ভব। লেখকঃ মীর হাসিব মাহমুদ, সহকারী অধ্যাপক, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়।
মন্তব্য করুন