


ইরান-আমেরিকা যুদ্ধে জ্বালানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ সংকট দীর্ঘ মেয়াদী হতে পারে। দিন যত যাবে এ সংকট বাড়তেই থাকবে। অথচ একটা দেশের শিল্পকারখানা ও যানবাহনের গতি সচল রাখার জন্য প্রতি মুহূর্তের জ্বালানি আবশ্যক। খাদ্য ছাড়া যেমন জীবন চলে না তেমনি জ্বালানি ছাড়াও দেশ চলে না। দেশের গতি সচল ও সক্রিয় রাখার জন্য জ্বালানির বিকল্প নেই। এর ভয়াবহ জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নিজেদের জ্বালানোর প্রতি নজর দিতে হবে।
আমরা অনেক কিছুর জন্যই পরের দিকে তাকিয়ে থাকি। নিজের ভিতরে যে এনার্জি আছে সেটাকে কাজে লাগানোর চিন্তা করি না, উদ্যোগও নেইনা। নিলে কিন্তু ভালো ফল পাওয়া যায়। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।
বাংলাদেশে কেন্দুপাতা দিয়ে বিড়ি বানানো হতো। পাতাটা আসতো ভারত থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে। জিয়াউর রহমানের সময় এই পাতা নিয়ে সংকট তৈরি হয়। ফলে বাংলাদেশে বিড়ির কারিগররা সংকটে পড়ে যায়। চোরাই পথে কেন্দুপাতা আনতে গিয়ে অনেকে সীমান্ত রক্ষীদের দ্বারা হতাহতের শিকার হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করলেন বিড়ি বানানোর জন্য পাতার দরকার নেই। তিনি বিডির উপযোগী কাগজ তৈরির দিকে মনোনিবেশ করলেন। তাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা চলে এলো। ভারত নির্ভরতা শেষ হয়ে গেল। জ্বালানি সংকটেও একই পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে।
আমাদের জ্বালানি তেল পশ্চিম থেকে আসে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই হচ্ছে আমাদের জ্বালানির মূল উৎস। সেখান থেকে পেট্রোল কেরোসিন ডিজেল লিকুইড গ্যাস সবই আসে। আর এগুলোর সরবরাহ করে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। আমাদের মাটির তলায় যে পর্যাপ্ত গ্যাস আছে সেগুলো উত্তোলন করলে যে আমাদের জ্বালানি চাহিদা অনেকটা পূরণ হয় সেদিকে কেউ নজর দেয় না।
বিগত বছরগুলোতে ফ্যাসিবাদী সরকার সব সময় আমদানির নির্ভরতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। আমদানি করলে সহজ প্রক্রিয়া অনেক বেশি লাভবান হওয়া যায়।
কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই প্রথম ব্যক্তি যিনি বাহির দেশের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উৎসের প্রতি নজর দিয়েছিলেন। তিনি মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের একত্রিত করে বলতেন ‘আমাদের দেশের মাটির নিচে তরল সোনা আছে। অর্থাৎ মহামূল্যবান জ্বালানি আছে। একদিন তোমাদের মত মেধাবী ছেলে মেয়েরা এই তরল সোনা উদ্ধার করবে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
আজ বিএনপি'র মত একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়। তাদের জাতীয়তাবাদী চেতনা ও স্বদেশপ্রেম প্রশ্নাতীত। তারা পরনির্ভরতার চেয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎসকে গুরুত্ব দেয়। নিজেদের সম্মান সম্পদকে গুরুত্ব দেয়। তারা ইন্টারনাল রিসোর্সকে মবিলাইজ করে দেশকে সমৃদ্ধ করতে চায়।
আমাদের পেট্রোল কেরোসিন ডিজেল না থাকুক পর্যাপ্ত গ্যাস তো আছে। সেই গ্যাস কূপগুলোই হতে পারে এ সময়ের রক্ষাকবচ। তার জন্য প্রয়োজন আরও বৃহৎ আকারে গ্যাস অনুসন্ধান এবং প্রাপ্ত গ্যাস উত্তোলন করে ব্যবহার পরিধি বিস্তৃত করা।
ভোলা দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন জনপদ একমাত্র জেলা সদর। বিচ্ছিন্ন হলেও সেখানে মহামূল্যবান জ্বালানি তথা গ্যাসের বিপুল মজুদ আছে। সেখানে সংরক্ষিত কয়েক ট্রিলিয়ন গ্যাস যদি ব্যবহারের আওতায় আনা যায় তাহলে জ্বালানি সংকট থেকে দেশ একটা দীর্ঘ সময়ের জন্য মুক্তি পেতে পারে। ইতোমধ্যে ভোলার গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সাপ্লাই দেয়া হচ্ছে। যে পরিমাণ গ্যাস মজুদ আছে তার এক দশমিকংশ মাত্র বিদ্যুতের কাজে লাগে।
অনেকগুলো কূপ খনন করে মুখে সিলগালা করে রাখা হয়েছে। সেগুলো থেকে গ্যাস আনার জন্য পাইপলাইন প্রয়োজন। অথবা ব্যাপক হারে সিলিন্ডারের সাহায্যে ঢাকায় আনা যেতে পারে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান কিশোর কাল থেকে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্যবার ভোলায় গেছেন। ভোলার অনেক স্থানে তার পদধলি পড়েছে। সেটাকে ভোলার মানুষ গৌরবের বিষয় বলে মনে করে। তার বন্ধুত্বের সংখ্যা যখন সীমিত ছিল তখন ভোলার মানুষরাই তার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়। আর যখন দেশব্যাপী জ্বালানি সংকট মারাত্মক আকারে দেখা দিয়েছে, জ্বালানির অভাবে চারদিকে হাহাকার পড়ে গেছে তখনও ভোলার গ্যাস প্রধানমন্ত্রীর দিকে হাত বাড়িয়ে রেখেছে।
মনে রাখতে হবে ভোলা মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন জনপদ হলেও একটি সমৃদ্ধ জনপদ। এখানে মাটির নিচে বিপুল গ্যাস এর পাশাপাশি অনেক সম্পদ বর্তমান। ভোলায় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শিল্পাঞ্চল হতে পারে, সমুদ্র বন্দর তথা কন্টেইনার বন্দর স্থাপিত হতে পারে, কৃষি উৎপাদন তথা ধান আলু তরমুজ সুপারি ইলিশ মহিষ গরু দুধ দুই এসব দিক থেকে অনেক এগিয়ে ভোলা। খাদ্যে উদ্বৃত্ত যে কয়টা জেলা তার মধ্যে ভোলা অন্যতম।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলব, আপনি ভোলার দিকে নজর দিন। ভোলার গ্যাসকে দ্রুত স্থানান্তরে নেয়ার ব্যবস্থা করুন। পাইলাম দিয়ে আনার আগে সিলিন্ডারের মাধ্যমে তরল গ্যাস এনে তাৎক্ষণিক জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করুন। পাইপলাইন দিয়ে গ্যাস আনার জন্য ভোলা বরিশাল-সেতু নির্মাণের দিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করুন।
আপনার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এখনো একমাস অতিবাহিত হয়নি। তার মধ্যে শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপী ভয়াবহ আকাশযুদ্ধ। তাতে অনেক রকম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে আমাদের দেশে স্বাভাবিক পথে আর তরল জ্বালানি আনা যাচ্ছে না।
বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অনেকগুলো নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে।
আপনার হাতে ১৮০ দিনের একটা পরিকল্পনা আছে। আমরা মনে করি এই ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় জ্বালানি সংকট সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবে। যদি দ্রুততার ভিত্তিতে ভোলার গ্যাস ব্যবহারের আওতায় আনা যায় তাহলে দেশ দ্রুত জ্বালানি সংকট থেকে মুক্তি পাবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! ভোলার মানুষ আপনাকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত আছে। আপনি আসুন। ভোলার মাটির নিচে এবং উপকূলীয় এলাকায় কয়েক ট্রিলিয়ন গ্যাস মওজুদ আছে। গ্যাস বিশেষজ্ঞরাই অনেক আগে এই মতামত দিয়েছেন। সেই গ্যাস উত্তোলন করে সংকট নিরসনের ব্যবস্থা করুন।
ভোলা আপনাকে ডাকছে। ভোলার গ্যাস আপনাকে দুই হাতে আহবান জানাচ্ছে, ভোলার জনতা আপনাকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় আছে। আপনি তাদের ডাকে সাড়া দিন। আশা করা যাচ্ছে মহাবিপদে ভোলার গ্যাস একটা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে আপনাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করতে পারে। এখন কেবল প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের দিয়ে ত্বরিৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
যুদ্ধের কারণে সাময়িক কষ্ট দেশের মানুষ সহ্য করবে। দীর্ঘমেয়াদী কষ্ট তারা মেনে নেবে না। তার সাথে উস্কানি দেয়ার জন্য কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারীরা তো আছেই। যারা দেশের দুর্দিনে সুপরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করার বদলে আঘাত করে সবকিছু নাস্তানাবুদ করে দিবে। সেটা মোকাবেলার জন্য আপনাকেও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। এ সময়ের মধ্যে যদি দেশীয় সম্পদ দেশীয় লোকবলের সাহায্যে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্যাসকে ঘরের কাছে আনা যায় তাহলে জ্বালানির পরনির্ভরতা থেকে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট
মন্তব্য করুন