

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভাষণ (Hate Speech) এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি সংগঠিত রাজনৈতিক কৌশল। India Hate Lab–এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাকেই নগ্নভাবে উন্মোচন করেছে। ২০২৫ সালে দেশজুড়ে ১,৩১৮টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে—অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে চারটি। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ্য ছিল মুসলিম জনগোষ্ঠী। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়; এটি ভারতে রাজনীতির চরিত্রগত পরিবর্তনের দলিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—ঘৃণার ভৌগোলিক বিস্তার। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বিজেপি বা তাদের মিত্রশাসিত রাজ্যগুলোতে। বিপরীতে, বিরোধী দলশাসিত রাজ্যগুলোতে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা রাজ্য সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সুতরাং প্রশ্ন উঠতেই পারে—যেখানে বিজেপি ক্ষমতায়, সেখানে কেন ঘৃণার লাগাম আলগা?
এবারের চিত্র আরও ভয়ংকর এই কারণে যে, ২০২৫ সাল কোনো বড় নির্বাচন বছরের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবু ঘৃণাভাষণ কমেনি। এর অর্থ স্পষ্ট—সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আর শুধু ভোট আদায়ের হাতিয়ার নয়; এটি এখন শাসনব্যবস্থার দৈনন্দিন অনুষঙ্গ। ধর্মীয় শোভাযাত্রা, জনসভা, রাজনৈতিক সমাবেশ—সবখানেই মুসলমানদের ‘বহিরাগত’, ‘দেশের শত্রু’ বা ‘অভ্যন্তরীণ হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এই ভাষা কেবল অশালীন নয়, এটি সহিংসতার উসকানি। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় এক-চতুর্থাংশ বক্তৃতায় সরাসরি সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোথাও সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কট, কোথাও মসজিদ ও গির্জা ধ্বংসের দাবি, কোথাও আবার অস্ত্রধারণের আহ্বান। মুসলমানদের “উইপোকা”, “পরজীবী”, “অনুপ্রবেশকারী” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে—যা একটি জনগোষ্ঠীকে মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার সুস্পষ্ট প্রয়াস।
এই ঘৃণার নেতৃত্ব দিচ্ছে তথাকথিত ‘ফ্রিঞ্জ’ নয়, বরং ক্ষমতার কেন্দ্র। মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী ও শীর্ষ বিজেপি নেতারাই বহু ক্ষেত্রে বক্তা। ‘লাভ জিহাদ’, ‘জনসংখ্যা জিহাদ’, ‘ভোট জিহাদ’—এই সব ষড়যন্ত্রতত্ত্বের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এগুলো অত্যন্ত কার্যকর। ভয় তৈরি হয়, বিভাজন গভীর হয়, আর সেই ভয় থেকেই তৈরি হয় ভোটব্যাংক ও বৈষম্যমূলক নীতি।
বিজেপি প্রায়ই দাবি করে, তারা উগ্র গোষ্ঠীর বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিন্তু প্রতিবেদন ভিন্ন ছবি দেখায়। এখানে রয়েছে এক ধরনের ‘ডিভিশন অব লেবার’—সংগঠনগুলো মাঠে ঘৃণা ছড়ায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব উপরে থেকে সুর বেঁধে দেয়। পুলিশি ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসব বক্তব্য ছড়িয়ে দেয় বহুগুণে। ফলাফল—সম্পূর্ণ দায়মুক্তি (Impunity)।
এই কৌশলের মূল্য ভারতকে চুকাতে হচ্ছে গভীরভাবে। এটি সংবিধানের সাম্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার অঙ্গীকারকে দুর্বল করছে, সমাজকে বিপজ্জনকভাবে মেরুকরণ করছে এবং কোটি কোটি মুসলমানকে বৈষম্য ও সহিংসতার ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে—যে সময় বিশ্বজুড়ে ভারতের ভূমিকা ও অবস্থান গভীরভাবে পর্যবেক্ষিত হচ্ছে।
ঘৃণা কখনোই দুর্ঘটনাবশত ছড়ায় না। এটি ছড়ায় তখনই, যখন ক্ষমতাসীনরা একে রাজনৈতিকভাবে লাভজনক মনে করে এবং থামাতে অনিচ্ছুক থাকে। এখন সিদ্ধান্ত ভারতের নেতৃত্বের হাতে—তারা কি দেশকে এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরিয়ে আনবে, নাকি নীরব সম্মতির মাধ্যমে ঘৃণাকেই রাষ্ট্রনীতির অংশ করে তুলবে?
মোহাম্মদ সামসুল ইসলাম, শিক্ষক ও গবেষক, ইসলামের ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
মন্তব্য করুন
