

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


নিরাপদ, পুষ্টিকর ও টেকসই খাদ্যের সন্ধানে বাংলাদেশে চলছে এক নিঃশব্দ বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। এখানে প্রযুক্তি আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে প্রতিটি আহার হয়ে উঠছে স্বাস্থ্য, জ্ঞান ও সবুজ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় খাদ্য ব্যবস্থাকে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নতুন দিগন্ত খুলছে ফুড টেকনোলজি। এটি খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে।
কেন ফুড টেকনোলজি অপরিহার্য
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০–৪০ শতাংশ ফলমূল ও শাকসবজি ফসল কাটার পর নষ্ট হয়ে যায় (FAO, ২০২২)। অন্যদিকে নারী ও শিশুর মধ্যে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এখনও বড় সমস্যা। WHO পরামর্শ দিয়েছে—আয়রন, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবারই এ সমস্যার সমাধানে কার্যকর হতে পারে।
উচ্চচাপ প্রক্রিয়া (HPP), ভ্যাকুয়াম ও মডিফাইড অ্যাটমসফিয়ার প্যাকেজিং (MAP) ইতোমধ্যে খাবারের মান রক্ষা করে মেয়াদ বাড়াতে সহায়ক প্রমাণিত হয়েছে।
স্থানীয় উদ্ভাবনের কিছু দৃষ্টান্ত
ভিটামিন যুক্ত চাল দিয়ে স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম।
ট্রেসিবিলিটি প্রযুক্তিসহ ফ্রোজেন প্রি-কুকড মাংস বাজারজাতকরণ।
ইনস্ট্যান্ট নুডলসে ক্যালসিয়াম, আয়োডিন ও প্রোটিন সংযোজন।
সোলার টানেল ড্রায়ার দিয়ে আম, মাছ ও মসলা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে শুকানো।
কোল্ড চেইন উন্নত করে খাদ্য অপচয় প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস।
কলার খোসা ও কাঁঠালের বিচি থেকে পুষ্টিকর ময়দা তৈরি।
কৃষি প্রযুক্তিতে AI, IoT ও স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে ফলন বৃদ্ধি ও ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত।
রাসায়ন্যমুক্ত খাদ্যপণ্যে QR কোড ভেরিফিকেশন ও উন্নত প্যাকেজিং।
একাধিক ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারের মাধ্যমে কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাকে সরাসরি সংযুক্ত করা, ফলে মধ্যস্বত্বভোগী কমে ও অপচয় হ্রাস পায়।
পোর্টেবল মাটি পরীক্ষার যন্ত্র ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে AI-নির্ভর মাটির স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ ও সার ব্যবহারের পরামর্শ।
ব্লকচেইন-ভিত্তিক সরবরাহ প্ল্যাটফর্ম, যা হাজারো কৃষককে ভোক্তার সঙ্গে সংযুক্ত করে আয় বাড়াচ্ছে ১০–১৫ শতাংশ পর্যন্ত।
সামনে যেসব বাধা
মাত্র ১৫ শতাংশ খাদ্যপ্রতিষ্ঠান HACCP বা ISO 22000 মানদণ্ডে কাজ করছে।
সংবেদনশীল খাদ্যের মধ্যে ১০ শতাংশেরও কম সঠিক কোল্ড চেইনে পরিবহিত হয়।
দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, বিশেষত গ্রামীণ এলাকায়, উদ্ভাবনে বাধা সৃষ্টি করছে।
নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি
২০১৩ সালের ফুড সেফটি অ্যাক্ট অনুসারে গঠিত BFSA ও BSTI শতাধিক খাদ্য মানদণ্ড বাস্তবায়নে কাজ করছে। সরকারি ল্যাবগুলো এখন GS-MS, ELISA ও HPLC প্রযুক্তি ব্যবহার করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
ভবিষ্যতের পথচলা
ল্যাব-গ্রোন মাংস, উদ্ভিদ-ভিত্তিক প্রোটিন ও 3D প্রিন্টেড স্ন্যাকসের মতো নতুন গবেষণা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ব্লকচেইন-ভিত্তিক ট্রেসেবিলিটি চাল, মাংস ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে যুক্ত হচ্ছে।
গবেষণা, শিক্ষা ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিতে পারে। এর মাধ্যমে অপুষ্টি কমবে, অপচয় হ্রাস পাবে এবং একটি নিরাপদ, টেকসই পুষ্টি ভবিষ্যৎ তৈরি হবে।
লেখক: সিইও, পরিচালক ও পেস্ট্রি শেফ; ব্যাচেলর অব পেস্ট্রি আর্টস, টেইলরস ইউনিভার্সিটি (মালয়েশিয়া) ও ইউনিভার্সিটি অব টুলুজ (ফ্রান্স) এর যৌথ ডিগ্রিধারী।
মন্তব্য করুন
