

যানজটের শহরে মেট্রোরেল রাজধানীবাসীর কাছে অনেকটা আশীর্বাদ হিসেবে ধরা দিয়েছিল। কারণ সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হলেও, মেট্রোরেল দিয়ে দ্রুতগতিতে উত্তরা থেকে মতিঝিল সড়কে যাতায়াত সম্ভব। কিন্তু মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর থেকে কারিগরি ত্রুটি ও নানা জটিলতার কারণে এর জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে।
মেট্রোরেল চলাচলের সময় কম্পনরোধে ব্যবহৃত স্প্রিং (বিয়ারিং প্যাড) ছিটকে পড়ে রাজধানীর ফার্মগেটে এক পথচারীর মৃত্যু হয়। একই এলাকায় এ ঘটনা গত বছরও একই ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ের এসব ঘটনার কারণে সহজ যাত্রার মেট্রোরেল এখন আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা গেছে, রোববার (২৬ অক্টোবর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনসংলগ্ন বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটের সামনে বিয়ারিং প্যাড ছিটকে পড়ে এক পথচারীর মৃত্যু হয়। নিহতের নাম আবুল কালাম আজাদ (৩৫)। চার ভাইয়ের মধ্যে ছোট আবুল কালাম স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে নারায়ণগঞ্জের পাঠানতলি এলাকায় বসবাস করতেন। তার ছেলে আব্দুল্লাহর বয়স ৫ বছর এবং মেয়ে সুরাইয়া আক্তারের বয়স ৩ বছর। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি।
আবুল কালাম আজাদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় একটি ট্রাভেল এজেন্সি পরিচালনা করতেন। ব্যবসায়িক কাজে নিয়মিত ফার্মগেট এলাকায় যাতায়াত করতেন তিনি। ব্যক্তিগত কাজেও তিনি প্রায়ই ওই এলাকায় যেতেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনের সামনে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করছে মেট্রোরেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা। দুর্ঘটনার স্থানে উৎসুক জনতার ভিড় দেখা যায়। দ্রুত একযোগে যেন ট্রেন চলতে পারে সে জন্য কাজ চলমান আছে। ওই ঘটনার পর এখন পর্যন্ত মেট্রোরেলের পুরো অংশ একসাথে চলাচল বন্ধ আছে। তবে মতিঝিল থেকে শাহবাগ এবং বিজয় সরণি থেকে উত্তরা পর্যন্ত যাত্রী সেবা চালু করেছেন মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে দুপুরে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের জানান, রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড ছিটকে পড়ে নিহত আবুল কালামের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এছাড়া পরিবারে যদি কোনো কর্মক্ষম ব্যক্তি থাকে, তাকে মেট্রোরেলে চাকরির সুযোগ দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানিয়েছেন ফাওজুল কবির খান।
এই ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব কবীর মিলন এক ফেসবুক স্ট্যাটাস দেন। তিনি বলেন, হ্যালো মেট্রোরেল, নির্মাণ কাজের ওয়ারেন্টি কত বছর ছিল? উপর থেকে এটা-ওটা ভেঙে নিচে না পড়ার ওয়ারেন্টি কত বছর ছিল? সামনে যে বিয়ারিং প্যাড খুলে আর কারো মাথায় পড়বে না, সেটার গ্যারান্টি দেবেন কিনা?
নির্মাণ ত্রুটি, তদারকি, নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করা হয়েছিল কিনা? হলে কারা কারা দায়ী এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা? যিনি আজ মারা গেলেন, তার যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কিনা?
এই "বারবার" হওয়ার দায়ভার এতদিন নেওয়া হয়নি কেন? কয়জনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে? না হয়ে থাকলে গদিতে এখনো আছেন কেন?
নিহতের পরিবারকে দিতে হবে ১ কোটি টাকা। এই টাকা দেবে নিম্নমানের বিয়ারিং প্যাড সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং অবহেলা ও ভাগ খাওয়া সরকারি কর্মকর্তারা। যারা এই প্যাড রিসিভ করে চালিয়ে দিয়েছে। এদের সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে বলে জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিয়ারিং প্যাড পড়ে যাওয়ার ঘটনায় দায় আছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ড. হাদিউজ্জামান এনপিবি নিউজকে বলেন, এক বছর আগেও আমরা একই ঘটনা দেখেছি। তখন প্রাণহানি হয়নি। আমি যেভাবে দেখছি, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় এবং খুব কাছাকাছি একটা পিয়ারের উপরে এটা পড়েছে। এই ঘটনাটি দেখে আমি ধারণা করছি এখানে নকশাগত ত্রুটি আছে। কারণ এটা অনেকটা কার্ভের মধ্যে বিয়ারিং প্যাড বসে আছে, যা স্টেট সেগমেন্টের উপর মেলানো যাবে না। সেখানে বিয়ারিং প্যাড ধরে রাখার জন্য যে ডাইনিং পোস্ট দেওয়ার কথা, সেটি দেওয়া হয়েছে কিনা?
তিনি বলেন, রেস্ট্রেইন করার মেকানিজম ছিল কিনা সেটি অডিট করে দেখা দরকার আছে। তবে আমি যেটা বলবো, নকশা যারা করেছেন, যারা নির্মাণ করেছেন তাদের অবশ্যই দায় আছে। যেহেতু আমরা ব্যয়বহুল মেট্রোরেল নির্মাণ করেছি, যারা কনসালট্যান্ট ছিল তাদের পিছনে বড় অঙ্কের একটি ব্যয় করা হয়েছে। এটা তাদের বুঝার উচিত ছিল। প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ ছিল, তবে সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েই নকশাটা করতে হবে।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক এই পরিচালক আরও বলেন, এই ঘটনায় মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষেরও দায় আছে। তাদেরও কাজটা বুঝে নিতে হবে নকশা ঠিকমতো হয়েছে কিনা। ব্যাটিং করার যে বিষয়টা, নকশা ব্যাটিং সেটি করতে হবে। আমাকে পরামর্শ দল একটি নকশা দিয়ে যাবে, সেটি ব্যাটিং করবো না, তার জন্য যদি ঝুঁকি তৈরি হয়; সেটির দোষ আমি পরামর্শককে দিবো, তার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
ড. হাদিউজ্জামান বলেন, এখন আমাদের মেট্রোরেলের বিশেষ করে বাঁক দেওয়া স্থানগুলোর বিয়ারিং প্যাড জায়গামতো আছে কিনা, প্রত্যেকটি সেটি দেখতে হবে। নকশায় যদি ত্রুটি থাকে, সেটি ঠিক করতে হবে। সেই সঙ্গে পুরো করিডোরে যেখানে বিয়ারিং প্যাড আছে সেগুলোও ঠিকমতো আছে কিনা দেখতে হবে। তাছাড়া, এই বিয়ারিং প্যাডগুলো ব্যবহারে গুণগত মান ঠিক আছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন