


দেশজুড়ে আবারও তীব্র হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকাতেও দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে গ্রামাঞ্চল।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, হঠাৎ তৈরি হওয়া এই সংকটের পেছনে মূলত চারটি কারণ কাজ করছে—এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত, গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়া, কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়া। এর সঙ্গে তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কা
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে এলএনজি সরবরাহে ব্যাঘাতকে। মহেশখালীর সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অনেক কমে গেছে।
অন্যদিকে এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালও কারিগরি সমস্যার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। দুটি টার্মিনাল থেকেই সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এলএনজি কার্গো না আসা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের উন্নতির সম্ভাবনা কম। এ কারণেই বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
গ্যাসের অভাবে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় গ্যাসের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু গ্যাসের অভাবে বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে মাত্র তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে গিয়ে লোডশেডিং বাড়ছে।
গ্যাসের সংকট শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই প্রভাব ফেলছে না। শিল্পকারখানাগুলোও নিজস্ব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে তারাও জাতীয় গ্রিডের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকটে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।
কয়লা সরবরাহেও বিঘ্ন
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হওয়ার পর কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ বাড়ার কথা। কিন্তু সেখানেও স্বস্তির খবর নেই।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন ঘটায় কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পায়রা ও নোরিংকো বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কয়েক শ মেগাওয়াট কমে গেছে।
ফলে গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের একাধিক উৎস একই সময়ে সংকটে পড়ায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি আরও বেড়েছে।
কমেছে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি
দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে আমদানি করা বিদ্যুতের ওপরও নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বর্তমান সংকটের মধ্যে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও কমেছে। আদানি পাওয়ার থেকেও কয়েক শ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ আসছে।
দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ঘাটতি আরও বেড়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
চাহিদাও বেড়েছে
জ্বালানি সংকটের সঙ্গে এবার বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদাও বড় ভূমিকা রাখছে। তীব্র গরমে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। গ্যাসের সংকটে বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে।
শিল্পকারখানাগুলোও গ্যাসের অভাবে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, এক পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াটে। রাতের দিকে ঘাটতি আরও বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
গ্রামাঞ্চলে দুর্ভোগ বেশি
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় এসব এলাকায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
ফলে অনেক এলাকায় দিনে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
রংপুর, কুড়িগ্রাম, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। শিল্প উৎপাদনেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
রাজধানী ও আশপাশের এলাকাতেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। কেরানীগঞ্জ, বাড্ডা, পান্থপথ, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে।
স্বস্তি মিলবে কবে?
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম। এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কঠিন। ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বড় উন্নতির জন্য নতুন এলএনজি কার্গো আসার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে।
সরকারও বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। মালয়েশিয়া থেকে অন্তত একটি এলএনজি কার্গো আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, গ্যাস ও এলএনজির সরবরাহ বাড়াতে সম্ভাব্য সব বিকল্প নিয়ে সরকার কাজ করছে। তবে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। তাই আমদানি করা জ্বালানি এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, নতুন এলএনজি সরবরাহ না আসা পর্যন্ত সংকট পুরোপুরি কাটবে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট তাৎক্ষণিকভাবে সামাল দেওয়া গেলেও একই ধরনের সমস্যা ভবিষ্যতে আবার তৈরি হতে পারে। এ জন্য দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানির নিশ্চয়তা দিতে হবে।
পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। দেশের সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানও বাড়াতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, শুধু তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি সংগ্রহ করে সংকট মোকাবিলা করলে স্থায়ী সমাধান হবে না। স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে যুক্ত করে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, আপাতত স্বস্তির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহুমুখীকরণ—দুই দিকেই একসঙ্গে নজর দিতে হবে।
সূত্র: সমকাল