

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হঠাৎ একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় আটকা পড়েছেন তিন হাজার পাঁচশোর বেশি বাংলাদেশি ওমরাহ যাত্রী (মুতামির)।
অনেকের টিকিট বাতিল হওয়ায় দেশে ফেরার উপায় নেই, আবার প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হওয়ায় থাকা-খাওয়ার খরচও আর বহন করছে না ট্রাভেল এজেন্সিগুলো।
নতুন করে দেশে ফিরতে ৫০-৬০ হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হচ্ছে- কিন্তু অনেকের কাছেই সেই অর্থ নেই। ফলে চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন তারা।
শুক্রবার বিকেল ৩টা ৫২ মিনিটে সৌদি আরবের মক্কায় বাংলাদেশ হজ মিশনে আসেন দুই বাংলাদেশি মুতামির। একজন রাজশাহীর মো. আজাদ, অন্যজন মুন্সীগঞ্জের রিয়াজুল হায়দার। তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল শনিবার। কিন্তু এয়ার অ্যারাবিয়ার ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তারা দেশে ফিরতে পারেননি।
এখন তাদের হাতে টাকা নেই, নেই দেশে ফেরার টিকিটও। নতুন করে টিকিট কাটতে ট্রাভেল এজেন্সির মালিক ৫০-৬০ হাজার টাকা দাবি করছেন। এ অবস্থায় সহায়তার আশায় তারা মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনে যান এবং মিশনপ্রধান কনসাল কামরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন।
তাদের অভিযোগ শোনার পর সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির মালিক মাজেদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেন হজ কর্মকর্তা। দরিদ্র মুতামিরদের জন্য কিছু টাকা ভর্তুকি দেওয়ার অনুরোধও জানান তিনি।
মক্কায় বাংলাদেশ হজ মিশনের প্রধান কনসাল কামরুল ইসলাম জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এয়ারলাইন্স হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ করতে আসা সাড়ে তিন হাজারের বেশি যাত্রী আটকা পড়েছেন। তাদের কেউ মক্কায়, কেউ মদিনায় অবস্থান করছেন।
তিনি বলেন, অনেক মুতামিরের টিকিট বাতিল হয়ে গেছে। ট্রাভেল এজেন্সিগুলো নতুন করে টিকিট কাটতে বলছে এবং এজন্য অতিরিক্ত ৫০-৬০ হাজার টাকা করে চাইছে।
কামরুল ইসলাম বলেন, “অনেক যাত্রী হোটেলের বিল দিতে পারছেন না। কারও কারও খাবার খাওয়ার টাকাও নেই। নানা সমস্যা নিয়ে প্রতিদিনই তারা বাংলাদেশ হজ মিশনে আসছেন। আমরা অভিযোগ শুনে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির মালিকদের সঙ্গে কথা বলছি।”
তিনি আরও বলেন, “এ সংকটে দেশে ফেরার জন্য যাত্রীদের কেন নতুন টিকিটের পুরো টাকা দিতে হবে—এ বিষয়টি আমরা এজেন্সি মালিকদের বলছি। অনেকেই সহযোগিতা করছেন।”
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ফ্লাইট বা টিকিট বাতিল হলে এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত টাকা ফেরত দেয়, তবে এটি সময়সাপেক্ষ। তাই আপাতত আটকে পড়া যাত্রীদের নতুন টিকিট কিনেই দেশে ফিরতে হচ্ছে। তবে যেসব এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালু আছে, তাদের ক্ষেত্রে নতুন টিকিট কাটার প্রয়োজন হচ্ছে না।
মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনে প্রতিদিনই সাহায্যের আশায় ভিড় করছেন বাংলাদেশিরা।
রাজশাহীর মুতামির মো. আজাদ জানান, দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে ওমরাহ পালন করতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবে আসেন তিনি। দেশে ফেরার কথা ছিল ৭ মার্চ। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এয়ার অ্যারাবিয়ার ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়।
তিনি বলেন, এখন দেশে ফিরতে নতুন করে টিকিট কিনতে ৫০ হাজার টাকা চাইছে ট্রাভেল এজেন্সি। আমি গরিব মানুষ, এত টাকা কোথায় পাব? খাব কী, থাকব কোথায়—কিছুই বুঝতে পারছি না।
তার সঙ্গে আসা আরও ১০ জন মুতামির একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন বলেও জানান তিনি।
আরেক মুতামির রিয়াজুল হায়দার বলেন, “এক সপ্তাহ ধরে নিজ খরচে হোটেলে থাকা-খাওয়া করছি। ট্রাভেল এজেন্সি কোনো সহযোগিতা করেনি। এখন ইন্ডিগো এয়ারে কলকাতা হয়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করছি।”
গত শনিবার দুপুরে মক্কার মিশফালাহ এলাকার পাশে বাংলাদেশ হজ মিশনে গিয়ে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জের মো. দিদার, সাইফুল হক ও ছিদ্দিক আহমদসহ কয়েকজন মুতামির সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছেন।
তারা জানান, প্রত্যেকে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্যাকেজে ওমরাহ করতে সৌদি আরবে এসেছিলেন। তাদের এমিরেটসের ৩ মার্চের ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে। গত এক সপ্তাহ ধরে নিজেদের খরচে হোটেলে থাকা-খাওয়া করতে হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন হোটেল ভাড়া ৪০০ রিয়াল। এর সঙ্গে খাবারের খরচ যোগ হয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দেশে ফিরতে নতুন টিকিটও কিনতে হবে।
তারা জানান, তাদের হোটেলেই আরও ২৭ জন বাংলাদেশি ওমরাহ যাত্রী একই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
সূত্র জানায়, আগের টিকিট বাতিল হওয়ায় কাউকে ৫০ হাজার, কাউকে ৬০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিয়ে নতুন টিকিট কিনতে হচ্ছে। এ হিসাবে সাড়ে তিন হাজার যাত্রীর দেশে ফিরতে অতিরিক্ত প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
এদিকে আটকে পড়া যাত্রীদের দেশে ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল বলে জানান হজ মিশনের প্রধান কনসাল কামরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করে বিমানের দুটি বিশেষ ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং অনুমতিও পাওয়া যায়। কিন্তু দেশ থেকে খালি উড়োজাহাজ এসে জেদ্দা থেকে যাত্রী নিয়ে গেলে প্রতি টিকিটের খরচ প্রায় এক লাখ টাকা পড়ত। খরচ বেশি হওয়ায় শেষ মুহূর্তে সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।
বর্তমানে যেসব নিয়মিত ফ্লাইট চালু আছে, সেগুলোর খালি থাকা টিকিট ৫০-৬০ হাজার টাকার মধ্যে কিনে পর্যায়ক্রমে আটকে পড়া যাত্রীদের দেশে ফেরানো হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে ওমরাহ যাত্রীদের ওপরও।
ফলে অনেক বাংলাদেশি এখন মক্কা ও মদিনা থেকে ভারতের কলকাতা হয়ে ইন্ডিগো এয়ারে ঢাকা বা চট্টগ্রামে ফিরছেন বলে মক্কায় বাংলাদেশ হজ মিশন সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র : চ্যানেল 24
মন্তব্য করুন
