

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


একই পরিবারে একাধিক সন্তানের মধ্যে মা এবং বাবা কি কোনো সন্তানকে একটু বেশি পছন্দ করেন? প্রশ্নটি সহজ হলেও উত্তরটি বেশ কঠিন। অনেক সন্তান ছোটবেলা থেকেই অনুভব করেন, ভাই-বোনের তুলনায় মা এবং বাবা হয়তো কোনো সন্তানকে বেশি সময় দিচ্ছেন, বেশি সুযোগ দিচ্ছেন বা তার প্রতি একটু বেশি আন্তরিক।
এই অনুভূতি সব সময় বাস্তব একতরফা বা পক্ষপাতের সাথে মিলবে না। তবে কোনো সন্তান যদি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে কম প্রিয় বা অবহেলিত মনে করেন, সন্তান মানসিক সুস্থতা ও পারিবারিক সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
মা এবং বাবার কাছে একজন সন্তানকে অন্যদের তুলনায় বেশি ঘনিষ্ঠ মনে হওয়া, সন্তান সঙ্গে বেশি সময় কাটানো বা সন্তান প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা সাধারণভাবে পছন্দের পার্থক্য হিসেবে দেখা হয়।
তবে সন্তানদের মধ্যে প্রয়োজনের পার্থক্য থাকতে পারে। একজনের পড়াশোনায় বেশি সহায়তা দরকার হতে পারে, অন্যজন অসুস্থ হতে পারে, অথবা কারও বয়সের কারণে বাড়তি যত্ন দরকার হতে পারে।
পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানের প্রতি মা এবং বাবার আচরণে পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। কোনো কোনো কারণে দেখা যায়, মা এবং বাবার সঙ্গে সন্তানের ঘনিষ্ঠতা, সময় কাটানো এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একজন অন্যদের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারে।
তবে কে সবচেয়ে প্রিয় তা নির্ধারণ করা সহজ নয়। কারণ মা এবং বাবা এবং সন্তান একই আচরণকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
একজন মা এবং বাবা মনে করতে পারেন, তিনি সব সন্তানকে সমানভাবে ভালোবাসেন। অন্যদিকে কোনো সন্তান হয়তো মনে করতে পারেন, ভাই বা বোনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই অনুভূতিই অনেক সময় সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গবেষণায় কিছু সাধারণ প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। বয়স, জন্মক্রম, স্বভাব এবং মা ও বাবার সঙ্গে মূল্যবোধের মিল—এসব বিষয় সন্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
শান্ত স্বভাবের, দায়িত্বশীল এবং মা ও বাবার সঙ্গে সহজে মানিয়ে চলা সন্তানদের সঙ্গে অনেক সময় মা এবং বাবার যোগাযোগ তুলনামূলক সহজ হয়। ফলে তাদের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই বেশি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে।
আবার ছোট সন্তানদের প্রতি বেশি যত্ন বা মেয়েদের প্রতি বিশেষ আচরণের প্রবণতাও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। তবে এসব কোনো সার্বজনীন নিয়ম নয় এবং পরিবার ও সংস্কৃতিভেদে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
অনেক সন্তান মনে করেন, ভালো ফলাফল, চাকরি, অর্থনৈতিক সাফল্য বা সামাজিক অবস্থানের কারণে মা এবং বাবা তাকে বেশি পছন্দ করবেন। কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব বিষয়ই যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
বরং মা এবং বাবা ও সন্তানের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং যোগাযোগের ধরন অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কোনো সন্তান যদি দীর্ঘদিন মনে করেন যে তাকে ভাই-বোনের তুলনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাহলে তার মধ্যে অভিমান, আত্মসম্মানবোধে আঘাত, হতাশা বা পরিবারের প্রতি দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
শৈশবের এমন অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনেও সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মা এবং বাবার পক্ষপাতের অভিজ্ঞতা হলেই প্রত্যেক সন্তানের মানসিক সমস্যা তৈরি হবে। ব্যক্তির স্বভাব, পারিবারিক পরিবেশ ও অন্যান্য অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানদের মধ্যে প্রয়োজনের পার্থক্য থাকলেও আচরণে অযথা তুলনা করা উচিত নয়। একজন সন্তানকে অন্যজনের সামনে বেশি প্রশংসা বা বেশি সুবিধা দিলে অন্য সন্তানের মনে অবহেলার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
কোনো কারণে একজন সন্তানকে বাড়তি সময়, অর্থ বা সহায়তা দিতে হলে তার কারণটি অন্য সন্তানদের বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বোঝানো যেতে পারে। এতে ভুল বোঝাবুঝি অনেকটাই কমে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ রাখা। তাদের অনুভূতিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে শোনা দরকার।
পরিবারে একজন সন্তান বেশি সুবিধা পেলে তার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। ভাই-বোনের সঙ্গে দূরত্ব, অপরাধবোধ কিংবা মা এবং বাবার প্রত্যাশা পূরণের চাপ তাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।
অর্থাৎ, সন্তানদের মধ্যে তুলনা বা অতিরিক্ত পক্ষপাত শেষ পর্যন্ত পরিবারের কারও জন্যই খুব ভালো ফল বয়ে আনে না।
মা এবং বাবা সব সন্তানকে সমানভাবে ভালোবাসলেও তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন বা আচরণ সব সময় হুবহু একই নাও হতে পারে। তবে কোনো সন্তান যদি নিয়মিত নিজেকে অবহেলিত মনে করেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সন্তানের প্রয়োজন বুঝে তাকে সময় দেওয়া, তুলনা না করা এবং প্রত্যেক সন্তানের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশ করা—সুস্থ পারিবারিক সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সন্তান মা এবং বাবার ভালোবাসা কতটা পেয়েছে, তার পাশাপাশি সেই ভালোবাসা সে কীভাবে অনুভব করেছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

