

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


অনেকেই ছোটবেলা থেকে পরিচিত একটি প্রবাদ শুনে বড় হয়েছেন—ভোরে ঘুম থেকে ওঠা নাকি সফলতার চাবিকাঠি। তবে বাস্তব জীবনে দেখা যায়, সবাই এই নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন না। সমাজে এমন মানুষ যেমন আছেন যারা সূর্য ওঠার আগেই দিনের কাজ শুরু করেন, তেমনি আবার অনেকেই রাত গভীর হলে কাজে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়—বরং মানুষের শরীর নিজেই ঠিক করে দেয় কখন সে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, মানুষের শরীরে একটি প্রাকৃতিক সময়সূচি কাজ করে, যাকে সার্কাডিয়ান রিদম বলা হয়। এই ছন্দ অনুযায়ী কেউ ভোরে বেশি কর্মক্ষম, আবার কেউ রাতের নীরবতায় নিজের সেরা কাজটি করতে পারেন। সাধারণভাবে মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—সকালপ্রিয়, রাতপ্রিয় এবং মাঝামাঝি ধরণের।
বয়সের সঙ্গে এই ধরণ বদলে যায়। শিশুদের মধ্যে ভোরে ওঠার প্রবণতা থাকলেও কৈশোরে এসে রাত জাগার প্রবণতা বাড়ে। পরে জীবনের মাঝামাঝি সময়ে তা কিছুটা স্থির হয় এবং বার্ধক্যে গিয়ে আবার ভোরমুখী অভ্যাস ফিরে আসে। গবেষকরা বলছেন, শরীরে মেলাটোনিন হরমোনের ওঠানামাই এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করে।
জিনগত কারণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের সময় নির্ধারণে শতাধিক জিন ভূমিকা রাখে। ফলে পরিবারগতভাবে কারও মধ্যে রাত জাগা বা ভোরে ওঠার প্রবণতা থাকতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশও একটি বড় ভূমিকা রাখে। শহরের কৃত্রিম আলো মানুষকে রাত জাগায়, আর প্রাকৃতিক আলোর প্রাচুর্য মানুষকে ভোরে ওঠায় অভ্যস্ত করে।
ঘুম বিশেষজ্ঞরা মানুষের এই ধরণকে আরও সূক্ষ্মভাবে চার ভাগে ভাগ করেছেন। কেউ সূর্যের সময় মেনে চলেন, কেউ রাতেই বেশি সক্রিয়, কেউ খুব ভোরে উঠে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন, আবার কেউ কম ঘুমিয়েও সতর্ক থাকেন। যদিও তাদের মধ্যে অনিদ্রার সমস্যা বেশি দেখা যায়।
স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় ভোরে ওঠা মানুষেরা কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকলেও রাতজাগা ব্যক্তিদেরও কিছু সুবিধা রয়েছে। বিশেষ করে সৃজনশীলতা ও স্মৃতিশক্তির ক্ষেত্রে। তবে দীর্ঘদিন গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকার অভ্যাস থাকলে স্থূলতা, বিষণ্ণতা এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে ঘুমের পরিমাণ ও গুণগত মান। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। সময়টি ভোর হোক বা রাত—নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমই সুস্থতার মূল শর্ত।
বাস্তবতা হলো, পেশা বা জীবনযাত্রার কারণে অনেক সময় নিজের স্বাভাবিক ছন্দ অনুযায়ী চলা সম্ভব হয় না। তবু নিজের শরীরের সবচেয়ে কার্যকর সময়টুকু চিহ্নিত করে কাজের পরিকল্পনা করলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো যায়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শরীরের স্বাভাবিক ছন্দকে অগ্রাহ্য না করে বরং সেটির সঙ্গে সমন্বয় করেই জীবনযাপন করা উচিত। কারণ, নিজের ভেতরের এই অদৃশ্য ঘড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়েই সুস্থ ও সুষম জীবন গড়ে ওঠে।
মন্তব্য করুন
