


আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগে, ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম শহর শিকাগোতে একটি রাস্তার একাংশ বাংলাদেশের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট, শহীদ জিয়াউর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়েছিল। সে সময় শিকাগো ট্রিবিউন পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ‘শহরের রজার্স পার্ক এলাকার নর্থ ক্লার্ক স্ট্রিট-এর একাংশকে সম্মানসূচক ‘জিয়াউর রহমান ওয়ে’ নামকরণের প্রস্তাব শিকাগো সিটি কাউন্সিলে কোন বিতর্ক ছাড়াই অনুমোদন পায়।’
ওই ঘটনার এক যুগ পরে, ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ যথাযোগ্য মর্যাদায় তাদের প্রিয় নেতার ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালন করছে। শুধু তাই নয়! যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চার গুণেরও বেশি (বিশ্বের সবচেয়ে বেশি) জনসংখ্যার দেশ ভারতও এবার শামিল হয়েছে তাতে।
জিয়াউর রহমানের নামের আগে ‘শহীদ’ এবং ‘বীর উত্তম’ উল্লেখ করে তার স্বাধীনতার ঘোষণার কথা স্মরণ করে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাই কমিশন লিখেছে, ‘আজ বাংলাদেশের জনগণ যখন জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম-এর স্মরণে সমবেত হয়েছে, তখন আমরা ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত সেই বিখ্যাত বেতার ভাষণের কথা স্মরণ করছি, যা জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছিল, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পথে তাঁদের অনুপ্রাণিত করেছিল এবং জাতীয় মুক্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।’
কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা নিউজ পোর্টাল 'দ্য ওয়াল'-এর এক প্রতিবেদনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘বিএনপি এবং বাংলাদেশ সরকারের তরফে প্রয়াত প্রেসিডেন্ট তথা দলনেতার স্মৃতিচারণায় দেশব্যাপী অসংখ্য অনুষ্ঠান সংগঠিত হয়েছে। তবে বিশেষ মাত্রা পেয়েছে জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাই কমিশনের বার্তা। ওয়াকিবহাল মহল জানাচ্ছে এই প্রথম জিয়াউর রহমানের মৃত্যু দিনে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশন তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বার্তা দিয়েছে।’
দেশপ্রেমিক জিয়াউর রহমান দেশকে ভালোবেসে সম্মানিত হয়েছেন সারা বিশ্বে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে ২০০৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে প্রথম সার্ক পুরস্কার প্রদান করা হয়। তার জ্যেষ্ঠ সন্তান (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমান উক্ত সম্মাননা গ্রহণ করেন। সে সময় সার্কের বিদায়ী চেয়ারপার্সন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজ জিয়াউর রহমানকে সার্কের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আর, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বলেছিলেন, জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা সার্কের ধারণাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। প্রথম সার্ক পুরস্কারের মাধ্যমে তার স্মৃতিকে সম্মান জানানো অত্যন্ত যথাযথ হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন।
মিশরের প্রেসিডেন্ট, নোবেলজয়ী আনোয়ার সাদাত শহীদ জিয়াকে দেশটির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান “অর্ডার অফ দ্য নাইল”-এ ভূষিত করেছিলেন। ১৯১৫ সাল থেকে প্রবর্তিত পুরস্কারটি দেশটির জন্য অমূল্য অবদান রাখা নাগরিকদের পাশাপাশি মানবতার জন্য কাজ করা বিদেশি ব্যক্তিদেরও দেওয়া হয়। বিশ্বখ্যাত বর্ণবাদ-বিরোধী আন্দোলনের নেতা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নেলসন ম্যান্ডেলা; জাপানি সম্রাট আকিহিতো, ব্রিটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসিপ ব্রজ টিটোর (মার্শাল টিটো নামেও পরিচিত) মতো বিশ্বনেতারা উক্ত সম্মাননা লাভ করেছিলেন।
ওদিকে, ১৯৭৮ সালে মার্শাল টিটোর বয়স যখন ৮৬ বছর, জিয়াউর রহমানের বয়স তখন মাত্র ৪২ বছর। অর্ধেকেরও কম বয়সী জিয়াকে মার্শাল টিটো অত্যন্ত পছন্দ করতেন বলে শোনা যায়। জিয়া-ই একমাত্র বাংলাদেশি যাকে তিনি যুগোস্লাভিয়ার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান “অর্ডার অফ দ্য যুগস্লাভ স্টার”-এ ভূষিত করেন।
এখানেই শেষ নয়। জিয়াউর রহমান তার জীবদ্দশায় উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে দেশটিতে প্রবর্তিত সর্বপ্রথম সম্মাননা 'হিরো অফ দ্য রিপাবলিক' খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে উত্তর কোরিয়ায় এক রাষ্ট্রীয় সফরের সময় তার নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ওই সম্মানসূচক খেতাব প্রদান করা হয়েছিল। কিউবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো, লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো নেতারাও উক্ত সম্মাননা লাভ করেছিলেন।
বিদেশের পাশাপাশি নিজ দেশেও সম্মানিত হয়েছেন জিয়া। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বের পুরস্কার- বীর উত্তম খেতাব। ২০০৩ সালে লাভ করেন মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক এই সম্মাননা ১৯৭৭ সালে তিনি-ই প্রবর্তন করেছিলেন।
পরিশেষে, একথা অকপটে বলা যায় যে, দেশকে ভালোবেসে দেশে দেশে সম্মানিত হয়েছিলেন জিয়া। জিয়ার মৃত্যুর পর তৎকালীন দেশ পত্রিকা যা লিখেছিল তার সারমর্ম এমনঃ শাসন করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে মানুষটিকে আমরা দেখেছি নাগরিকদের অধিকারের পবিত্রতা লঙ্ঘন না করতে, দেশকে দিকনির্দেশনাহীন হতে না দিতে এবং জাতীয় পরিচয়, ঐতিহ্য ও স্বাধীনতাকে প্রোথিত করতে- তিনি আজ হয়তো আমাদের মাঝে নেই; কিন্তু, তার আদর্শ, দিকনির্দেশনা এবং অনুসারীরা রয়ে গেছেন। সেজন্যই, আমরা সেই দিকনির্দেশনাকে হারাতে পারি না। প্রেসিডেন্ট জিয়ার দেখানো পথ-ই আমাদের পথ।
লেখক: তারিক চয়ন, প্রথম সচিব (প্রেস), কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন।