সোমবার
০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিটফোর্ড হাসপাতালে ই-টিকিট না থাকায় রোগীদের দুর্ভোগ 

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

১৮৫৮ সালের ১লা মে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে যাত্রা শুরু করেছিল ঢাকার প্রথম আধুনিক হাসপাতাল ‘মিটফোর্ড হাসপাতাল’। তৎকালীন ঢাকা জেলার কালেক্টর রবার্ট মিটফোর্ডের দান করা সম্পত্তি ও উইলের অর্থে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি বর্তমানে ‘স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল’ নামে পরিচিত। ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলায় হাসপাতালটি রাজধানীসহ আশপাশের জেলার লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে। তবে আধুনিক যুগে এসেও এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও বহির্বিভাগে টিকিট সংগ্রহ ব্যবস্থা রয়ে গেছে সেই পুরনো ধাঁচে। ফলে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজারো রোগীকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে যখন দেশজুড়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, তখন ঐতিহ্যবাহী এই হাসপাতালে এখনো অনলাইনে টিকিট সংগ্রহের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতিদিন হাজারো রোগীকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে মিটফোর্ড হাসপাতালের মতো পুরনো ও ব্যস্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা চালু হলে রোগীদের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। পাশাপাশি হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের তৎপরতাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ভোর না হতেই হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। চিকিৎসক দেখানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা আল্ট্রাসনোগ্রাফির সিরিয়াল পেতে শত শত রোগীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকের ভাগ্যে জুটছে না কাঙ্ক্ষিত টিকিট। নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা কাউন্টার থাকলেও রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে সকাল থেকেই লাইন দীর্ঘ হতে থাকে। বয়স্ক, শিশু ও গুরুতর অসুস্থ রোগীর স্বজনদেরও এই লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা নিয়ে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন মাত্র ১০টি আল্ট্রাসনোগ্রাফির টিকিট বিতরণ করা হয়। ফলে ভোরে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক রোগী টিকিট পান না। ১০ জনের পর যাদের অবস্থান, তাদের কাউন্টার থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পরদিন আবার নতুন করে লাইনে দাঁড়াতে হয় তাদের। এতে একদিকে যেমন রোগীদের সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে চিকিৎসা প্রক্রিয়াও বিলম্বিত হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমিত সুযোগ এবং টিকিট সংকটের কারণে তাদের চরম মূল্য চকাতে হচ্ছে।

হাসপাতালের কাউন্টার ব্যবস্থাপনায় দেখা গেছে, বহির্বিভাগের টিকিট বিতরণের জন্য মোট ১০টি কাউন্টার রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি নারী রোগীদের জন্য, চারটি পুরুষ রোগীদের জন্য এবং একটি কাউন্টার স্টাফ, মুক্তিযোদ্ধা ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ। অন্যদিকে, প্যাথলজিক্যাল টেস্টসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার জন্য রয়েছে ৫টি কাউন্টার। যার মধ্যে একটি কাউন্টার স্টাফ, মুক্তিযোদ্ধা ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত এবং বাকি চারটির মধ্যে দু’টি পুরুষ ও দু’টি নারী রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হয়।

কাগজে-কলমে কাউন্টার সংখ্যা বেশি মনে হলেও রোগীর বিপুল চাপের তুলনায় তা একেবারেই পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন হাজারো রোগী চিকিৎসা নিতে আসলেও সেবার পরিধি সেই হারে বাড়েনি। এখানে অবিলম্বে ডিজিটাল টোকেন ব্যবস্থা করা এবং আল্ট্রাসনোগ্রাফির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার টিকিট সংখ্যা বাড়ানো উচিত।

মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা কুলসুম নওয়াজ বলেন, “শিশু সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বাচ্চা অস্থির হয়ে পড়েছে। এখানে রোগীদের জন্য বসারও কোনো ব্যবস্থা নেই। অনলাইনে টিকিট কাটার ব্যবস্থা থাকলে আমাদের এই ভোগান্তি হতো না।”

পুরান ঢাকার বাসিন্দা আবু বক্কর বলেন, “সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে। কিন্তু টিকিট কাটতেই যদি কয়েক ঘণ্টা চলে যায়, তাহলে চিকিৎসা নেবে কখন? অনেক সময় লাইনের সুযোগ নিয়ে দালালরা এসে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবি করে।”

হাঁটতে কষ্ট হওয়া ঢাকার জেলার নবাবগঞ্জ থেকে আসা বৃদ্ধা রাজিয়া খাতুন বলেন, “বয়সের কারণে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না। তারপরও সকাল সকাল এসে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। আমাদের মতো বৃদ্ধদের জন্য হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থা করা দরকার।”

সার্বিক বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, “রোগীদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে টিকিট সরবরাহের জন্য আমরা ইতিমধ্যে আলাদা কাউন্টার জোন তৈরি করেছি।”

ডিজিটালাইজেশনের বিষয়ে তিনি জানান, হাসপাতালে ভোগান্তি কমাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ই-টিকিটিং সিস্টেম চালুর জন্য ইতিমধ্যে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে রোগীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Brazil VS Norway
Scheduled
06 Jul, 02:00 AM
VS
World Cup