বৃহস্পতিবার
০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তারকা যখন 'মনের মানুষ', জানুন প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপের ভয়াবহতা

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপের কাল্পনিক চিত্র
expand
প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপের কাল্পনিক চিত্র

প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ (Parasocial Relationship) শব্দটা শুনতে একটু জটিল মনে হলেও, এর পেছনের অনুভূতিটা আমাদের সবার খুব পরিচিত। সহজ বাংলায় বলতে গেলে- এটি এমন এক ধরণের একতরফা মানসিক সম্পর্ক, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ কোনো একজন তারকা, ইনফ্লুয়েন্সার, কাল্পনিক চরিত্র বা বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের প্রতি তীব্র আবেগীয় টান অনুভব করেন।

পর্দার ওপারে থাকা মানুষটি হয়তো জানেনই না আপনার অস্তিত্বের কথা, অথচ আপনার মনে হয় তিনি আপনার খুব চেনা, আপনার "মনের মানুষ"!

এটি কীভাবে তৈরি হয়?

১৯৫৬ সালে সমাজবিজ্ঞানী ডোনাল্ড হর্টন এবং রিচার্ড হল প্রথম এই ধারণার অবতারণা করেন। বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এটি আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

একজন তারকা যখন ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন, ভ্লগে তার প্রতিদিনের জীবনের গল্প শেয়ার করেন, তখন আমাদের মস্তিষ্ক অবচেতনভাবেই ধরে নেয় যে তিনি সরাসরি আমাদের সাথেই কথা বলছেন।এটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় Illusion of Intimacy বলা হয়।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবের কারণে এখন প্রিয় তারকার শোবার ঘর থেকে শুরু করে তাদের সুখ-দুঃখের গল্প- সবই হাতের মুঠোয়। ফলে তাদের প্রতি এক ধরণের মায়া ও আপনত্ব তৈরি হয়।

প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কের ভালো-মন্দ

সব সম্পর্কের মতোই এরও দুটি দিক আছে। এটি পুরোপুরি ক্ষতিকর বা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়, যতক্ষণ না এটি সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে।

ইতিবাচক দিক

• একাকীত্ব দূর করা: একাকীত্ব বা বিষণ্ণতার সময়ে প্রিয় কোনো কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা চরিত্রের ভিডিও মানুষকে মানসিক স্বস্তি দেয়।

• অনুপ্রেরণা: প্রিয় তারকার কঠোর পরিশ্রম বা সাফল্য অনেক সময় বাস্তব জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার তাগিদ দেয়।

• কমিউনিটি ফিলিং: একই তারকার ভক্তদের (যেমন: BTS-এর ARMY বা নির্দিষ্ট কোনো ক্রিকেট তারকার ফ্যানবেস) সাথে মিলে একটি বড় সামাজিক বৃত্ত তৈরি হয়, যা মানুষকে কোনো একটি দলের অংশ হিসেবে অনুভব করায়। নেতিবাচক দিক (The Dark Side)

• বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরত্ব: যখন কেউ বাস্তব জীবনের বন্ধু বা পরিবারের চেয়ে পর্দার মানুষটিকে বেশি সময় ও গুরুত্ব দিতে শুরু করে।

• অবাস্তব প্রত্যাশা: পর্দার তারকাকে নিখুঁত ভেবে মানুষ নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গী বা বন্ধুদের কাছ থেকেও অবাস্তব পারফেকশন আশা করতে শুরু করে, যা পরে হতাশা বাড়ায়।

• ক্রাশ বা অবসেশন: প্রিয় তারকার কোনো স্ক্যান্ডাল, বিয়ে বা সম্পর্কে জড়ানোর খবরে যখন কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বা তীব্র হিংসা অনুভব করে, তখন এটি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোতে ভুল বোঝাবুঝি, জটিলতা বা প্রত্যাখ্যানের ভয় থাকে। কিন্তু প্যারাসোশ্যাল সম্পর্কে সেই ভয় নেই; কারণ পর্দার তারকা কখনোই আপনাকে আঘাত করবেন না বা ছেড়ে যাবেন না। এই নিরাপদ অনুভূতির কারণেই মনের অজান্তেই মানুষ স্ক্রিনের মানুষটিকে নিজের "মনের মানুষ" বা আইডিয়াল পার্টনার বানিয়ে ফেলে।

প্রিয় কোনো তারকার কাজে মুগ্ধ হওয়া বা তাকে বন্ধু ভাবা খুবই স্বাভাবিক ও মানবিক। তবে মনে রাখা জরুরি- স্ক্রিনের ওপাশের মানুষটি আসলে একটি সম্পাদিত (edited) ও সুন্দরভাবে উপস্থাপিত রূপ মাত্র। তাই পর্দার জগতকে বিনোদন হিসেবে উপভোগ করে, বাস্তব জীবনের রক্ত-মাংসের সম্পর্কগুলোর যত্ন নেওয়াই সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন