শুক্রবার
১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৭ জুলাই ২০২৬, ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিরিয়ানির হাঁড়িতে কেন লাল কাপড় থাকে?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম
এনপিবি কোলাজ
expand
এনপিবি কোলাজ

বিরিয়ানির দোকানের সামনে গেলেই দূর থেকে চোখে পড়ে লাল কাপড়ে জড়ানো একটা বড়সড় হাঁড়ি। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে এই ধারা চলে আসছে।

লাল কাপড় জড়ানো এই হাঁড়ি দেখেই ক্রেতারা সহজে বুঝতে পারেন, এটি একটি বিরিয়ানির দোকান।

বহু যুগের এই প্রথা বর্তমানে বিরিয়ানির এক প্রকার ‘ট্রেডমার্ক’ বা নীরব পরিচয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন বিরিয়ানির হাঁড়ি সবসময় লাল কাপড়ে জড়ানো থাকে? এর পেছনে কী রহস্য লুকিয়ে আছে?

ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ করলে এই লাল কাপড়ের পেছনে বেশ কিছু চমকপ্রদ কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।

১. মুঘল আমলের রাজকীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাস

বিরিয়ানির হাঁড়িতে লাল কাপড় জড়ানোর মূল ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে মুঘল আমলে। ইতিহাস বলে, মুঘল সম্রাট হুমায়ূন যখন শেরশাহের কাছে পরাজিত হয়ে রাজ্য হারিয়ে ইরানে (তৎকালীন পারস্য) আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন পারস্য সম্রাট তাকে লালগালিচার উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

শুধু তাই নয়, সেখানে খাবার পরিবেশনের একটি বিশেষ দরবারি রীতি ছিল। রূপার পাত্রে পরিবেশিত খাবারগুলো রাজকীয় লাল কাপড়ে ঢাকা থাকত, আর ধাতব ও চিনামাটির পাত্রের খাবার ঢাকা থাকত সাদা কাপড়ে।

পারস্যের এই আভিজাত্যময় পরিবেশনা সম্রাট হুমায়ূনের মন কেড়ে নেয় এবং পরবর্তীতে তিনি যখন পুনরায় ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, তখন এই রীতি তার দরবারেও প্রচলন করেন।

পরবর্তীতে বিরিয়ানি যখন মুঘলদের হাত ধরে ভারতবর্ষে পা রাখে এবং লক্ষ্মৌয়ের নবাবদের রান্নাঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন থেকেই এই খাবারটির আভিজাত্য ও বনেদিয়ানা প্রকাশে লাল কাপড়ের ব্যবহার শুরু হয়।

সেই রাজকীয় প্রথাই হয়তো আজও এই অঞ্চলের বিরিয়ানির হাঁড়িতে টিকে রয়েছে।

২. আভিজাত্য ও রঙের ভাষা

মুখের ভাষার মতো রঙেরও একটা নিজস্ব ভাষা আছে, যা মানুষের চিন্তায় প্রভাব ফেলে। রান্নাবিদ ও ইতিহাসবিদদের মতে, লাল রঙের সাথে এক ধরনের ‘খানদানি’ বা আভিজাত্যের ব্যাপার জড়িয়ে আছে।

সমাজ জীবনে উষ্ণতা ও বনেদিয়ানা প্রকাশে লাল বা লালসালুর ব্যবহার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যেমন- বিশিষ্ট ব্যক্তি বা বিদেশী অতিথিদের জন্য ‘লালগালিচা’ সংবর্ধনা, মাজার বা উরস শরিফে লালসালুর পতাকা, কিংবা পান ও পনিরওয়ালাদের লাল কাপড়ের ব্যবহার। বিরিয়ানির ক্ষেত্রেও এই খানদানি ভাবখানা প্রকাশ করতেই লাল রঙকে বেছে নেওয়া হয়েছিল।

৩. ক্রেতা আকর্ষণ

ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে লাল রঙের একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা রয়েছে। লাল রঙ মানুষের চোখকে দ্রুত আকর্ষণ করে। লাল কাপড়ে জড়ানো থাকায় দূর থেকেও ক্রেতারা বুঝতে পারেন যে এটি বিরিয়ানির দোকান এবং দোকানটি খোলা আছে। আধুনিক রেস্তোরাঁর সামনে যেমন ‘ওপেন’ (Open) কথাটি লেখা থাকে, বিরিয়ানির হাঁড়ির এই লাল কাপড়টি যেন ঠিক সেই শব্দেরই এক নিঃশব্দ রাজকীয় প্রকাশ।

৪. খাবার গরম রাখার বাড়তি সুবিধা

লাল কাপড়ের ব্যবহারের পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক বা ব্যবহারিক সুবিধাও রয়েছে। লাল রঙ সাধারণত গাঢ় হওয়ায় তা হাঁড়ির ভেতরের উত্তাপ দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে সহায়তা করে। ফলে ক্রেতারা সবসময় গরম-গরম বিরিয়ানির স্বাদ পেতে পারেন।

৫. লোকবিশ্বাস

পুরোনো দিনের মানুষের কাছে বিরিয়ানির হাঁড়িতে লাল কাপড় ব্যবহারের আরেকটি ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে, খাবারের ওপর যেন কোনো ‘খারাপ নজর’ বা ‘কুদৃষ্টি’ না পড়ে, তা থেকে চিকেন, মাটন, ডিম কিংবা কাচ্চি- পছন্দের তালিকায় বিরিয়ানি যারই থাকুক না কেন, এই খাবারের স্বাদের পাশাপাশি এর পরিবেশনার ঐতিহ্যও সমান আকর্ষণীয়।

কাপড়ের রঙ লাল হলেও এটি মূলত সৌভাগ্য, উষ্ণতা, আনন্দ-উৎসব আর ভালোবাসার আবেগের প্রতীক।

তাই বলা যায়, মুঘল আমলের ঐতিহ্য রক্ষা, ব্যবসার বিপণন কৌশল এবং আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবেই আজ অবধি বিরিয়ানির হাঁড়িতে লাল কাপড় স্বমহিমায় টিকে রয়েছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
France VS England
Scheduled
19 Jul, 03:00 AM
VS
World Cup