

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আমাদের ধারণা ছিল, নতুন প্রজন্ম অর্থাৎ ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন-জি (যাদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে) নারী-পুরুষের সমতার বিষয়ে অনেক বেশি উদার হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক জরিপ আমাদের একদম উল্টো এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্বের ২৯টি দেশের (যার মধ্যে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও ভারত অন্যতম) প্রায় ২৩ হাজার মানুষের ওপর এই জরিপটি চালানো হয়। এর ফলাফল যেমন চমকপ্রদ, তেমনি ভাববার মতো।
জরিপে দেখা গেছে, পুরোনো প্রজন্মের চেয়ে নতুন প্রজন্মের তরুণদের মধ্যেই পুরোনো বা ঐতিহ্যবাহী লিঙ্গভূমিকার ধারণা বেশি শক্তভাবে জেঁকে বসেছে।
জেন-জি পুরুষদের প্রায় ২৪ শতাংশ মনে করেন নারীদের খুব বেশি স্বাধীন বা স্বাবলম্বী হওয়া উচিত নয়। অথচ প্রবীণ ‘বেবি বুমার’ প্রজন্মের (জন্ম ১৯৪৬-১৯৬৪) পুরুষদের মধ্যে এই হার মাত্র ১২ শতাংশ।
জেন-জি পুরুষদের ৩৩ শতাংশের মতে, সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্বামীর কথাই শেষ কথা হওয়া উচিত। অন্যদিকে, প্রবীণদের মাত্র ১৩ শতাংশ মনে করেন স্ত্রীর সবসময় স্বামীর কথা মেনে চলা উচিত।
এই প্রবণতা শুধু পুরুষদের নয়, নারীদের মধ্যেও আছে। জেন-জি নারীদের ১৮ শতাংশ মনে করেন স্ত্রীর স্বামীর প্রতি বাধ্য থাকা উচিত, যেখানে প্রবীণ নারীদের মধ্যে এই মতের সমর্থন মাত্র ৬ শতাংশ।
নতুন প্রজন্মের তরুণদের মনে এক ধরণের দ্বিমুখী মানসিকতা বা দ্বিধা দেখা গেছে।
একদিকে, প্রায় ৪১ শতাংশ তরুণ পুরুষ মনে করেন সফল ক্যারিয়ার থাকা নারীরা পুরুষদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়। অন্যদিকে, তাদেরই একটি বড় অংশ আবার নারীর বেশি স্বাধীনতা পছন্দ করছেন না।
এমনকি যৌনতা ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পুরোনো ধারণা রয়ে গেছে। জেন-জি পুরুষদের ২১ শতাংশ মনে করেন, একজন 'প্রকৃত নারীর' কখনো নিজে থেকে যৌন সম্পর্কের সূচনা করা উচিত নয়। প্রবীণ পুরুষদের মধ্যে এই ধারণা মাত্র ৭ শতাংশের।
নারীর স্বাধীনতা ও বাধ্যতার বিষয়টি দেশ ও সংস্কৃতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। যেমন:
ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন স্ত্রীকে স্বামীর কথা মেনে চলা উচিত। এর বিপরীতে, এই মতের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে ২৩ শতাংশ এবং ব্রিটেনে মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ।
জরিপে অংশ নেওয়া ৫৯ শতাংশ জেন-জি পুরুষ মনে করেন, সমতা প্রতিষ্ঠার নামে এখন পুরুষদের কাছ থেকে একটু বেশিই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সমাজ পুরুষদের জন্যও কিছু নির্দিষ্ট ছাঁচ তৈরি করে দিয়েছে:
৩০ শতাংশ তরুণ পুরুষ মনে করেন বন্ধুদের ‘আই লাভ ইউ’ বা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলা উচিত নয়। ২১ শতাংশ মনে করেন, যে পুরুষরা শিশুদের যত্নে বেশি সময় দেন, তারা তুলনামূলক কম পুরুষালি।
অনেক সময় মানুষ ব্যক্তিগতভাবে যা বিশ্বাস করে, সমাজের চাপে মুখে তা বলতে পারে না। ব্রিটেনের একটি উদাহরণে দেখা যায়: মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন শিশুযত্নের দায়িত্ব নারীদেরই বেশি নেওয়া উচিত।
কিন্তু ৪৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, সমাজ আসলে নারীদের কাছ থেকে সেটাই প্রত্যাশা করে।
গবেষকদের মতে, প্রযুক্তি ও আধুনিকতার যুগেও এই পুরোনো মানসিকতার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন। আগের প্রজন্মে পুরুষদের প্রধান পরিচয় ছিল 'পরিবারের উপার্জনকারী' হিসেবে। কিন্তু বর্তমান যুগে চাকরি বা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তরুণদের জন্য আগের মতো সহজ নয়।
এই অনিশ্চয়তা থেকেই অনেকে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে দ্বিধায় ভুগছেন এবং পুরোনো ছাঁচে আশ্রয় খুঁজছেন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই শুধু উদযাপনের দিন নয়; এটি গভীরভাবে ভাবার দিন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সমতা ও পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে হলে পরিবার, শিক্ষা ও সমাজ- সব জায়গায় সচেতনতা প্রয়োজন।
কারণ সমতা মানে কোনো এক পক্ষের জয় নয়, এটি এমন এক সমাজ গড়া, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।