সোমবার
১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০৩০ সালেই ৪.৬৫ লাখ চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা হারাবে ঢাকা

এনবিপি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানজনিত ক্ষতির মুখে পড়বে ঢাকা। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

বসবাসযোগ্য ভবিষ্যৎ: দক্ষিণ এশিয়ার শহরে চরম তাপের মধ্যে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি সুরক্ষার উপায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকায় তাপপ্রবাহের কারণে যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে, তা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ। এটি ওই সময় শহরের মোট বার্ষিক কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও তীব্র হলে এই ক্ষতি বাড়তে থাকবে। ২০৫০ সালে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে ৭ লাখ ৮ হাজার এবং ২০৮০ সালে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হতে পারে। সে সময় কর্মঘণ্টা হারানোর হার বেড়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাবে।

দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর তুলনায় শীর্ষে ঢাকা

প্রতিবেদনে ঢাকা, নয়াদিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, আহমেদাবাদ, সুরাট ও বারানসির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ২০৩০ সালে কলকাতায় প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার, নয়াদিল্লিতে ২ লাখ ৬৬ হাজার, মুম্বাইয়ে ২ লাখ ৪ হাজার, চেন্নাইয়ে ১ লাখ ৪১ হাজার, আহমেদাবাদে ৯৯ হাজার, সুরাটে ৯৭ হাজার এবং বারানসিতে ৫১ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হতে পারে। এসব শহরের মধ্যে ঢাকার ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে, যা দেশের জিডিপির ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান। তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠলে এই ক্ষতির হার আরও দ্রুত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় চরম তাপপ্রবাহ এখন আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন, তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এর ফলে মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে।

ঝুঁকিতে ৭০ কোটির বেশি মানুষ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালের ৭০ কোটির বেশি মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে বছরে অন্তত একদিন খোলা পরিবেশের তাপমাত্রা মানুষের সহনক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে। এছাড়া প্রায় ১২ কোটি মানুষ প্রতিবছর অন্তত এক মাস চরম তাপের মধ্যে জীবনযাপন করেন।

তৈরি পোশাক খাতেও বাড়ছে চাপ

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, তীব্র তাপের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদনশীলতা ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), আইএফসি ও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার পোশাক খাতে সর্বোচ্চ ৬৫.৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড-এর প্রশংসা করা হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নত কর্মপরিবেশে বিনিয়োগের ফলে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে ২৭০টির বেশি লিড (LEED) সনদপ্রাপ্ত কারখানা গড়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, তাপসহনশীল শহর গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।

ভারতের আহমেদাবাদে ২০১৩ সাল থেকে চালু হওয়া হিট অ্যাকশন প্ল্যানের ফলে প্রথম দুই বছরেই তাপপ্রবাহে মৃত্যুর হার ৪৭ শতাংশ কমেছে এবং প্রায় ২ হাজার ৩৮০ জনের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণ বলছে, ভারতের শহরগুলোতে তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে প্রায় ৫০ ডলার সমমূল্যের সুফল পাওয়া যায়।

বাড়ছে দারিদ্র্যের ঝুঁকি

অন্যদিকে, জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা বছরে গড়ে ২৩.৭৫ কর্মদিবসের সমপরিমাণ কাজ হারাতে পারেন। একই সময়ে এই দুই খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার ৬.২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, চরম তাপের কারণে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া, স্বাস্থ্যব্যয় বৃদ্ধি এবং আয় কমে যাওয়ার ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে, কারণ তাদের অধিকাংশেরই স্বাস্থ্যবিমা বা আয়ের সুরক্ষা নেই।

অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ও সতর্ক করে বলেছেন, দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এমন অবস্থায় রয়েছে যে, সামান্য ধাক্কাতেই তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ সেই ধাক্কাগুলোর অন্যতম হয়ে উঠতে পারে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন