রবিবার
২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উপকূলে লবণাক্ততার ছোবল, কেটে ফেলতে হচ্ছে নারীদের জরায়ু  

বি.এম মনিরুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম
এনপিবি গ্রাফিক্স
expand
এনপিবি গ্রাফিক্স

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে (যেমন-খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট) লবণাক্ততা বেড়েছে। আর এই লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অঞ্চলের নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। কারণ লোনা পানিতে দীর্ঘ সময় কাজ করা এবং ঋতুস্রাবের সময় অপরিচ্ছন্ন লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে নারীদের মধ্যে জরায়ু সংক্রমণ, টিউমার ও প্রজননতন্ত্রের জটিলতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সেজন্য অল্প বয়সেই জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন এই এলাকার অনেক নারীই।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, জলোচ্ছ্বাস, জলাবদ্ধতা এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই জেলাটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম।

এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাবে নারীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে সময়মতো চিকিৎসা পেলে সহজেই নিরাময়যোগ্য অনেক রোগও দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই স্বাস্থ্যসংকট শুধু নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। অসুস্থ মায়েদের গর্ভে জন্ম নেওয়া অনেক শিশুই অপুষ্টি, কম ওজন এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যজটিলতা নিয়ে পৃথিবীর আলো দেখে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বাসিন্দা মাছুরা খাতুন (২৬) এনপিবি নিউজ-কে বলছিলেন তার জীবনের কথা। তিনি বলেন, প্রচণ্ড সাদাস্রাব হয় আর চুলকায়। ঘণ ঘণ প্রস্রাব হয়। আর প্রসাব করতে গেলে খুব জ্বালা-পোড়া করে। প্রসাব করার পর এতোটাই কষ্ট হয় যা মুখে বলে বোঝাতে পারবো না। সাথে তো তলপেট খুব ব্যথা আছেই, কোমরের অংশ অবশ হয়ে যায়, মনে হয় পেটের ভেতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে নিচে নেমে আসছে।

মাছুরা খাতুনের সবে মাত্র এক বছর বিয়ে হয়েছে, এখনো তাদের দাম্পত্য জীবনে সন্তানের মুখ দেখতে পারেনি। কিন্তু ইতোমধ্যে গ্রাম্য ডাক্তাররা তার জরায়ু কেটে ফেলার পরামর্শও দিয়েছেন। তবে এই বয়সে জরায়ু কাটতে মাছুরার স্বামী রাজি হয়নি। আপাতত চিকিৎসা নিচ্ছে।

যশোর শহরে এক হাসপাতালে সাতক্ষীরা থেকে চিকিৎসা নিতে আসে পারভীনা খাতুন (২৮)। কোন সমস্যার জন্য পারভীনা চিকিৎসা নিতে এসেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক বছর ধরে আমার ধাতুর (সাদাস্রাব) সমস্যা ছিল। বিয়ের পরে প্রথম সন্তান হওয়ার পর থেকেই জরায়ুতে জ্বালা-পোড়া ও যন্ত্রণা করতো। গ্রামের ডাক্তারের কাছে যেতাম ওষধ যা দিতো তা খেলে জ্বালা-পোড়া একটু কম হতো। একে একে ৩ সন্তান জন্ম দিয়েছি। পরে জানলাম জরায়ুতে ঘা হয়েছে। তখন অবস্থা খুব খারাপ ছিল। যশোর শহরের এক হাসপাতালে ভর্তি হলে অপারেশন করে জরায়ু ফেলে দেয় ডাক্তার।

তিনি বলেন, আমার বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি একই উপজেলায়। ফলে জন্ম থেকেই লোনা পানির সাথে বসবাস। তবে আগের তুলনায় যেন লোনাভাব বেড়েছে। গরমকালে লোনাভাব এত বাড়ে যে, পুকুরের পানি মুখেই নিতে পারি না। অথচ তাতেই গোসলসহ সব কাজ করতে হয়।

পারভীনার চেয়ে অনেক কম বয়সে জরায়ু ফেলতে বাধ্য হয়েছেন তারই প্রতিবেশী রেবেকা সুলতানা (২৪)। তার গল্পও একই রকম। প্রায় বছর দুয়েক আগে জরায়ুতে টিউমার দেখা যায়। সে কারণে পুরো জরায়ু ফেলে দেয়া হয় তার। জরায়ু অপারেশনের পর স্বামী ফেলে অন্যত্র বিয়ে করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঘন ঘন বন্যা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এর প্রভাবে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন এবং প্রসবজনিত জটিলতা, অকাল প্রসব ও নবজাতকের বিভিন্ন জন্মগত সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের সঙ্গে নারীদের বিভিন্ন প্রজননস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সমস্যা, যেমন যোনিপথ ও জরায়ুমুখের সংক্রমণ, বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে লবণাক্ত পানি সরাসরি জরায়ু ক্যান্সারের কারণ-এমন দাবির পক্ষে বর্তমানে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

এসব বিষয়ে কথা হয় জেনারেল ফিজিশিয়ানমেডিসিন, চর্ম, যৌন, মা ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল্লাহ আল লাইস-এর সঙ্গে।

তিনি এনপিবি নিউজ-কে বলেন, ‘লবণাক্ত পানি জরায়ু প্রদাহ বা সংক্রমণের (Cervicitis) জন্য সরাসরি দায়ী নয়। তবে, নারীর যোনিপথ এসিডিক কিন্তু লবণাক্ত পানি ব্যবহারে এসিডিটি কমে গিয়ে পিএইচ বেড়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক যেসব উপকার ব্যাক্টেরিয়া যোনিপথকে রক্ষা করত সেগুলো নষ্ট হয়ে ক্ষতিকর ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়ায় আক্রান্ত করে।’

কিন্তু এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর যে কয়েক লাখ নারী জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা। এ এলাকার নারীরা জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন।

২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলায় সুপেয় ও নিরাপদ পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। একই সঙ্গে এসব এলাকার বিভিন্ন পানির উৎসে অতিরিক্ত লবণাক্ততার পাশাপাশি আয়রন, আর্সেনিক ও ফ্লোরাইডের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়, যা স্থানীয় মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে।

উপকূলের নারীদের প্রাথমিকভাবে স্বাস্থ্যসচেতনার বিষয়ে ডা. আব্দুল্লাহ আল লাইস বলেন, এ অঞ্চলের নারীদের ক্ষতিকর ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তার কিছু প্রথামিক লক্ষণ হলো. সাদা স্রাবের পরিবর্তন: স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি স্রাব, স্রাবের রং হলদেটে, সবুজাভ বা ধূসর হয়ে যাওয়া, আঠালো বা পুঁজের মতো হওয়া এবং দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া।

তলপেটে ও কোমরে ব্যথা: তলপেটে চাপ বা হালকা ব্যথা, যা সবসময় থাকে বা মাঝে মাঝে বাড়ে। কোমরেও ব্যথা হতে পারে।

সহবাসের সময় সমস্যা: সহবাসের সময় ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা সহবাসের পরপরই হালকা রক্তপাত হওয়া।

অনিয়মিত রক্তপাত: মাসিক ছাড়াও মাঝে মাঝে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত যাওয়া।

প্রস্রাবে সমস্যা: প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা।

যোনিতে চুলকানি ও অস্বস্তি: যোনি মুখে চুলকানি, লাল হয়ে যাওয়া বা সবসময় ভেজা ভেজা অস্বস্তিকর অনুভূতি।

কিছু ক্ষেত্রে জ্বর বা সাধারণ দুর্বলতাও থাকতে পারে। উপরের যেকোনো একটি বা দুটি লক্ষণ যদি কয়েকদিনের বেশি থাকে, স্রাবে দুর্গন্ধ থাকে, বা সহবাসের পর নিয়মিত রক্তপাত হয়, তাহলে দেরি না করে একজন গাইনোকোলজিস্ট বা নারী রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে এনপিবি নিউজ-কে জানান তিনি।

পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু-জনিত কারণে মানুষ নিজ স্থান ছেড়ে অন্য স্থান চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ তীব্রতর হয়েছে, যার ফলে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এবং পুনরায় ২০১৭ সালে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে এর সর্বোচ্চ মাত্রা ৩.৫ ds/m-এ পৌঁছেছিল। এই প্রবণতার পেছনে প্রধানত ক্রমবর্ধমান শীতকালীন তাপমাত্রা, মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাস এবং জোয়ারের আগ্রাসনের প্রভাব রয়েছে। গড় উচ্চতা ৫.৩৫ মিটার হওয়ায় এসব এলাকায় বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। লবণাক্ততা যত ভেতরের দিকে প্রবেশ করে, পানীয়, সেচ এবং মৎস্য চাষের জন্য মিঠা পানির অভাব দেখা দেয়, যা এসব এলাকায় বসবাস করা জনগোষ্ঠী তাদের জীবন মান রক্ষার জন্য নিজেদের জমি ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।

পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় এবং অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে মিঠা পানির উৎস ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ ও পৃষ্ঠের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়েছে। ফলে নিরাপদ পানীয় জল সংগ্রহ করা যেমন কঠিন হয়ে পড়েছে, তেমনি দৈনন্দিন ব্যবহারেও মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার এবং সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন