


বলিউডে এমন অনেক তারকা রয়েছেন, যাঁদের ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল দারুণ সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁরা হঠাৎ করেই রুপালি পর্দা থেকে দূরে সরে যান। দর্শকের মনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরতে থাকে, কোথায় হারিয়ে গেলেন সেই অভিনেতা-অভিনেত্রীরা?
এই তালিকায় অন্যতম নাম মালিনী শর্মা। ২০০২ সালের জনপ্রিয় হরর সিনেমা ‘রাজ’-এ অভিনয় করে যিনি দর্শকের নজর কাড়েন। ছবিটির সাফল্যের পর তাঁর সামনে বলিউডে উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এরপরই অনেকটা নিঃশব্দে অভিনয়জগত থেকে সরে যান তিনি।
তবে মালিনীর এই বিদায় কোনো ব্যর্থতা কিংবা হতাশার ফল ছিল না। বরং নিজের পছন্দের জীবনকে গুরুত্ব দিয়েই তিনি ক্যামেরা থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
দীর্ঘ ২৩ বছর পর ফের ক্যামেরার সামনে দেখা গেল মালিনীকে। ফিরে এসে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়ে তিনি বললেন, ‘আমি বেঁচে আছি। আমি এখানেই আছি।’
মালিনীর এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য যেন দীর্ঘদিনের সেই প্রশ্নেরই উত্তর হয়ে এসেছে। এত বছর কোথায় ছিলেন তিনি, কেন বলিউড থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, সেই কৌতূহলের অবসান ঘটিয়েছে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন।
মালিনী শর্মার অভিনয়জীবনের শুরু সিনেমায় নয়, মডেলিং দিয়ে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ ও ২০০০–এর শুরুর সময়ে বম্বে ভাইকিংসের ‘কিয়া সুরত হ্যায়’ মিউজিক ভিডিও তাঁকে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তোলে। এরপর মিকা সিংয়ের ‘সাওয়ান মে লাগ গায়ি আগ’-এও দেখা যায় তাঁকে। সে সময় ভারতীয় পপ মিউজিকের সুবর্ণ সময়ে এই দুটি ভিডিও তাঁকে তরুণদের পরিচিত মুখে পরিণত করেছিল।
পরে মালিনী টেলিভিশনের জনপ্রিয় সিরিজ ‘ক্যাটস’-এ অভিনয় করেন। নাফিসা জোসেফ ও কুলজিৎ রন্ধাওয়ার সঙ্গে তাঁর উপস্থিতিও নজর কেড়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তী সময়ে ওই দুই অভিনেত্রী আত্মহত্যা করেন আর মালিনী সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন।
‘রাজ’ বদলে দিয়েছিল পরিচয় ২০০২ সালে বিক্রম ভাট পরিচালিত ‘রাজ’ মুক্তি পায়। বিপাশা বসু ও দিনো মোরিয়ার পাশাপাশি মালিনী শর্মার উপস্থিতিও দর্শকের নজর কাড়ে। বিশেষ করে ‘আপকে প্যায়ার মে’ গানটিতে তাঁর উপস্থিতি আজও অনেকের মনে রয়ে গেছে। ছবিটি বিশাল বাণিজ্যিক সাফল্য পায়। অনেকেই ভেবেছিলেন, এটাই মালিনীর দীর্ঘ বলিউড–যাত্রার শুরু। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল ঠিক উল্টোটা।
ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়
‘রাজ’-এর সময়ই অভিনেতা প্রিয়াংশু চ্যাটার্জির সঙ্গে বিয়ে করেন মালিনী। ‘তুম বিন’ অভিনেতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বেশি দিন টেকেনি। কয়েক বছরের মধ্যেই বিচ্ছেদ হয়। এর কিছুদিন পরই আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০০২ সালে ‘এনকাউন্টার’ ছবির শুটিং শুরু হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে তিনি প্রকল্পটি ছেড়ে দেন। পরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিনয়ের চেয়ে ক্যামেরার পেছনে কাজ করার আগ্রহ তখন তাঁর বেশি ছিল।
হারিয়ে যাননি, বদলে ফেলেছেন জীবন
বলিউড ছাড়ার সময় মালিনী কোনো নাটকীয় ঘোষণা দেননি। ধীরে ধীরে নিজেকে আলোচনার বাইরে নিয়ে যান। অনেক বছর পর তিনি ‘দ্য স্লো লোকাল’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেন। শুরুতে এটি ছিল স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, ছোট ছোট কর্মশালা এবং শিশুদের গল্প বলার অনুষ্ঠান ঘিরে একটি কমিউনিটি প্রকল্প। বাড়িতে তৈরি রুটি, গ্রানোলা, জ্যাম, পিনাট বাটার, দক্ষিণ ভারতীয় কফি, বিভিন্ন ধরনের তেল—এসব নিয়েও কাজ করেছেন তিনি।
শহর ছেড়ে পাহাড়ে
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘দ্য স্লো লোকাল’ প্রকল্পও বদলে যায়। এখন মালিনী মহারাষ্ট্রের সাহ্যাদ্রি পাহাড়ে, পুনে থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার দূরত্বে একটি ফার্মস্টে পরিচালনা করেন।
এখানে মালিনী নিজেই ফল-সবজি চাষ করেন। খামারে উৎপাদিত শাকসবজি দিয়েই অতিথিদের জন্য খাবার রান্না করা হয়। তাঁর কাছে কৃষিকাজ শুধু পেশা নয়, জীবনযাপনের দর্শন।
‘এটাই আমাদের ছোট্ট জঙ্গল’
মালিনীর ফার্মের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, তিনি প্রকৃতিকে বদলে দিতে চান না। জমিতে আগে থেকেই থাকা অর্জুন, হরীতকী, কোকুম, পলাশ ও শিকাকাইগাছ সংরক্ষণ করেছেন। পাহাড়ের একটি বড় অংশ তিনি একেবারেই স্পর্শ করেননি, যাতে বন্য পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকে। তাঁর ভাষায়, ‘এটা আমাদের নিজের ছোট্ট জঙ্গল। আমরা চাই না এই প্রাকৃতিক আবাস নষ্ট হোক।’
২৩ বছর পর ক্যামেরায় ফেরা
সম্প্রতি ‘দ্য স্লো লোকাল ডায়েরিজ’ নামে ভিডিও সিরিজ শুরু করেছেন মালিনী। প্রথম ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘অনেক দিন পর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম। এবার মেকআপ নেই, সংলাপ নেই, শুধু আমি।’ ভিডিওতে মালিনী বলেন, ‘“রাজ”-এর ২৩ বছর পর আবার ক্যামেরার সামনে। যাঁরা জানতে চাইছিলেন আমি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলাম, তাঁদের বলছি—আমি বেঁচে আছি, আমি এখানেই আছি।’
বলিউডে ফেরার সম্ভাবনা?
ভক্তদের একজন মালিনীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বলিউড ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাঁর কোনো আফসোস আছে কি না? মালিনীর উত্তর ছিল, ‘কে বলেছে আমি ছেড়ে দিয়েছি? আমি শুধু দিক বদলেছি। চাইলে আবার ফিরতেও পারি, আবার চলে যেতেও পারি।’
গ্ল্যামারের বদলে শান্তি
আজকের মালিনী শর্মার পরিচয় আর কেবল ‘রাজ’-এর অভিনেত্রী নয়। তিনি একজন কৃষক, উদ্যোক্তা, প্রকৃতিপ্রেমী এবং ধীরগতির জীবনযাপনের প্রবক্তা। একসময় যিনি ঝলমলে আলো, ক্যামেরা আর রেড কার্পেটের অংশ ছিলেন, আজ তিনি অতিথিদের নিজের খামারের সবজি দিয়ে রান্না করা খাবার পরিবেশন করেন, প্রকৃতির মধ্যে হাঁটেন আর বিশ্বাস করেন—সাফল্যের সংজ্ঞা সবার জন্য এক নয়।
বলিউড মালিনীকে খ্যাতি দিয়েছিল। কিন্তু সাহ্যাদ্রির পাহাড় তাঁকে দিয়েছে শান্তি। সে কারণেই হয়তো ২৩ বছর পর ক্যামেরার সামনে ফিরে এসে তাঁর প্রথম পরিচয় ছিল না ‘অভিনেত্রী’; বরং একজন মানুষ, যিনি নিজের শর্তে বাঁচতে শিখেছেন।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে