সোমবার
০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রুচিহীন বক্তব্যে ভরা ফেসবুক

আম্মারের বিতর্কিত মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা

এনপিবিনিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৮ এএম
সালাউদ্দিন আম্মার
expand
সালাউদ্দিন আম্মার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ও মন্তব্যে দেশজুড়ে আলোচিত ও সমালোচিত। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয় ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে তিন শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনার পর নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

এছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক ভাষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশালীন ও উসকানিমূলক মন্তব্য; এমন একাধিক ঘটনার কারণে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছেন এই ছাত্রনেতা।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রথম সারির জনপ্রিয় স্লোগানদাতা সমন্বয়ক পরিচিতি পাওয়া সালাউদ্দিন আম্মার গত বছর ১৬ অক্টোবর রাকসুর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে সরব ভূমিকা রাখেন।

সমর্থকদের কাছে তিনি ‘আপসহীন’ ছাত্রনেতা হলেও সমালোচকদের ভাষ্য, তিনি ধীরে ধীরে এমন এক রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন, যার কর্মকাণ্ডে শালীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখার চেয়ে আলোচনায় থাকার প্রবণতাই বেশি দৃশ্যমান।

ফেসবুকে বিতর্কই যেন নিয়মিত ঘটনা : সালাউদ্দিন আম্মারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয় ফেসবুককে কেন্দ্র করে। দীর্ঘদিন তার ভেরিফায়েড ব্যক্তিগত আইডিতে সাত লাখ ২০ হাজারের বেশি অনুসারী ছিলেন।

সম্প্রতি আইডিটি অকার্যকর হয়ে যাওয়ার দাবি করে তিনি অনুসারীদের জানান, এখন থেকে ‘সালাহউদ্দিন আম্মার- Salauddin Ammar’ নামের ফেসবুক পেজ থেকেই সক্রিয় থাকবেন। বর্তমানে ওই পেজে তিন লাখ ৬৮ হাজারের বেশি অনুসারী রয়েছে।

তার আইডি ও পেজ ঘুরে দেখা যায়, তিনি নিয়মিত রাজনৈতিক ও সমসাময়িক নানা ইস্যুতে পোস্ট দেন, অন্যের পোস্ট শেয়ার করে মন্তব্য করেন এবং বিরোধীদের উদ্দেশে প্রতিক্রিয়া জানান। তবে এসব পোস্টের বড় অংশেই অশালীন, কটূক্তিপূর্ণ ও বিদ্রুপাত্মক ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

যেসব মন্তব্যে আলোচিত-সমালোচিত : ৫ মে নিজের ফেসবুক আইডিতে তিনি লেখেন, ‘কুকুর বিড়াল মেরো না, নাস্তিক পেলে ছেড়ো না। লীগ পেলে ছেড়ো না।’ পোস্টটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই এটিকে উসকানিমূলক বক্তব্য আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

চৌধুরী শাহ রাত্রী নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, ‘বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত জিএসের ভাষা যদি এটি হয়, তাহলে তা ভয়ংকর। উসকানিমূলক বক্তব্যের দায়ে তাকে গ্রেফতার করা উচিত।’ সমালোচনার মুখে পোস্টটি পরে মুছে দেন আম্মার। এর কিছুদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত নীলা ইসরাফিলও আম্মারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে একটি ফেসবুক পোস্ট দেন।

সেখানে তিনি লেখেন, ‘আম্মারকে যদি আজকে আইনের আওতায় না নেওয়া হয়, তাহলে মবকে নরমালাইজড করা হবে। আজ যদি বিএনপি চুপ থাকে, তাহলে কাল এই একই আচরণ আরও বড় পরিসরে ফিরে আসবে।’ নীলার ওই পোস্টের জবাবে আম্মার মন্তব্যের ঘরে ‘যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ’ ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন। মন্তব্যটির স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।

২৩ এপ্রিল ডাকসুর কয়েকজন নেতার ওপর হামলার একটি ভিডিও শেয়ার করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে অশালীন ও কটূক্তিপূর্ণ ভাষায় পোস্ট দেন আম্মার। পোস্টে তিনি বিরোধীদের উদ্দেশে ‘শুয়োর’ ও ‘কুকুর’ শব্দ ব্যবহার করেন। একজন নির্বাচিত ছাত্রনেতার এমন ভাষা ব্যবহারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।

২২ এপ্রিল নিজের ফেসবুকে একটি কনডমের ছবি পোস্ট করে রাজনৈতিক বিদ্রুপ করেন আম্মার। পোস্টে কনডমের ছবি ব্যবহার করে ‘মুজিব সৈনিক’ ক্যাপশন দিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন তিনি। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।

৭ মে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন শেয়ার করে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় সালাউদ্দিন আম্মার লেখেন, ‘সাংবাদিকটার বাবা নিজের জমির অথেনটিক সার খাওয়াইয়া... ব্রেনটা... পাছুতে সেট করা হয়েছে। এভাবেই আমাদের এই ধরনের মেধাবী সাংবাদিকদের জন্ম।’

একই মাসে ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা এক পাকিস্তানি শিক্ষার্থীর সঙ্গে তোলা ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন। সেই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে সালাউদ্দিন আম্মার অশালীন মন্তব্য করেন।

সর্বশেষ আলোচিত ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে মারধরের ঘটনায় বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশের পর ২৯ জুলাই রাতে তার ফেসবুক পেজে পোস্টে লেখেন, ‘কিছু সাংবাদিক এমনভাবে নিউজ করছে যে আমি তাদের বিশেষ মুহূর্তে বিশেষ অঙ্গে চাপ দিয়ে বিশেষত্ব নষ্ট করে দিচ্ছি।’

শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কেউ তার বক্তব্যের সমালোচনা করলেও তাদের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক ও ট্রলধর্মী ভাষা ব্যবহার করেন।

কী বলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা : ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সজিবুর রহমান বলেন, আম্মার চাইলে সর্বজনীন সম্মানিত ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারতেন। কিন্তু তার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড তাকে এই সম্মান থেকে বিচ্যুত করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী তাসিন খান বলেন, একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধি হয়ে এরকম বেপরোয়া আচরণ কখনোই কাম্য ছিল না। তবে আজকের সালাউদ্দিন আম্মার এরকম বেপরোয়া হয়ে ওঠার পেছনে অনেক পক্ষের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ দায় আছে।

যেমন পোষ্য কোটা বাতিলের আন্দোলনের সময় যখন আম্মার প্রথম শিক্ষকের সঙ্গে অসন্তোষজনক আচরণ করেন তখন তিনি এভাবে তোপের মুখে পড়েননি। বরং শিক্ষার্থীরা তাকে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করেছিল। তার অ্যাপ্রোচ একই আছে। এখন যখন তা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থের বিপরীতে যাচ্ছে তখন আমাদের উপলব্ধি হচ্ছে যে তার কাজগুলো বিতর্কিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক হাবিব জাকারিয়া বলেন, চব্বিশ-পরবর্তী ঘটনা আর বাস্তবতা এক জিনিস নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই ধরনের কর্মকাণ্ড পছন্দ করছে না। আম্মারও বোধহয় নিজের ক্ষতি করছে।

মবসহ বিভিন্ন আলাপ হচ্ছে নানা ফরমে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নিয়েও রাষ্ট্র কোনো নিষ্পত্তি করতে পারেনি। এজন্য অনেক ঝামেলা থেকে গেছে। আম্মারের আরও অ্যালার্ট হওয়া দরকার। আমরা শিক্ষক হিসাবে কারও পক্ষে-বিপক্ষে যাব না। সবাই আমাদের ছাত্র। আমার পরামর্শ থাকবে-চব্বিশের যে উচ্চতা, সেটার ভালো জিনিসগুলোর ধারাবাহিকতা থাকাটা জরুরি।

অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, সমালোচক কারা এটার ওপর জবাব ডিপেন্ড করতেছে। আলোচনায় থাকলে সমালোচনা হবে। আমাদের অতিরিক্ত সুশীলতা ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়।

কুকুরকে কুকুর বলতে হবে, চাঁদাবাজকে চাঁদাবাজ বলতে হবে, গুটিবাজকে গুটিবাজ বলতে হবে। আমি যে ভাষায় কথা বলতেছি সেটার ভালো-খারাপ নিরূপণ করবে দেশের মানুষ। কোনো রাজনৈতিক পোষ্য প্রাণী নয়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন