

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তহবিলের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিয়ে সদ্য সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ এবং বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। একজন বলছেন করপোরেশনের হিসাবে এক হাজার কোটির বেশি অর্থ ছিল, অন্যজন দাবি করছেন ব্যবহারযোগ্য নগদ মাত্র ২৫ কোটি টাকা। দুই ধরনের এই তথ্য জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।
ডিএনসিসির হিসাব বিভাগের খসড়া স্থিতি বিবরণী অনুযায়ী, গত ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করপোরেশনের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব মিলিয়ে মোট অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগদ হিসেবে ছিল ৪২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন তহবিলে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে ছিল প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা। এই হিসাবই সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ তুলে ধরেছেন।
তবে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নগদ স্থিতির বড় অংশই বিভিন্ন নির্দিষ্ট তহবিলে সংরক্ষিত। যেমন- অবসর ভাতা ও অবসর সুবিধা তহবিলে প্রায় ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা, সাধারণ ভবিষ্য তহবিলে ৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা, শিক্ষা বৃত্তি তহবিলে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে প্রায় ৩০ লাখ ৭৩ হাজার টাকা রয়েছে। এছাড়া জামানত তহবিলেই জমা রয়েছে প্রায় ২৪১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ৮২৫ কোটি টাকার এফডিআরের মধ্যেও বড় অংশ বিভিন্ন নির্দিষ্ট তহবিলে রাখা। এর মধ্যে সাধারণ তহবিলে প্রায় ৬৪২ কোটি টাকা, জামানত তহবিলে ৭০ কোটি, শিক্ষা বৃত্তি তহবিলে ১০ কোটি, পেনশন তহবিলে ৫৬ কোটি এবং সাধারণ ভবিষ্য তহবিলে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা রয়েছে।
ডিএনসিসির হিসাব বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এসব অর্থের বড় অংশ সরাসরি উন্নয়ন বা পরিচালন ব্যয়ে ব্যবহারযোগ্য নয়। নির্দিষ্ট তহবিলের অর্থ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয়ের জন্য সংরক্ষিত থাকে। একইভাবে এফডিআরের অর্থ সাধারণত জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া নগদ ব্যয়ে ব্যবহার করা হয় না।
এদিকে বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন সম্প্রতি দাবি করেছেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের সময় করপোরেশনের সাধারণ তহবিলে নগদ ছিল মাত্র ২৫ কোটি টাকা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও ঠিকাদারি বিল পরিশোধের জন্য ব্যবহৃত সাধারণ তহবিলেই মূলত এই নগদ অর্থ ছিল।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিভিন্ন তহবিলে প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা এফডিআর হিসেবে সংরক্ষিত ছিল, যা মূলত দীর্ঘমেয়াদি দায় মেটানোর জন্য রাখা হয়েছে এবং তা নিয়মিত ব্যয়ের জন্য ব্যবহার করা যায় না।
প্রশাসকের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে সাধারণ তহবিলে নগদ ছিল ৫৯৭ কোটি টাকা। একই সময়ে বিভিন্ন তহবিলে এফডিআর ছিল ৮২৫ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয় প্রায় ১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা, ফলে ওই সময়ে মোট নগদ প্রবাহ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা।
তার দাবি, সাবেক প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন প্রকল্প ও বাজেট বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের ব্যয় হওয়ায় নগদ স্থিতি দ্রুত কমে আসে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে নগদ স্থিতি নেমে আসে প্রায় ৩৩৬ কোটিতে। পরে রাজস্ব আদায় বাড়লেও বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় অব্যাহত থাকায় চলতি বছরের শুরুতে নগদ অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বর্তমান প্রশাসকের অভিযোগ, সাবেক প্রশাসক বিভিন্ন তহবিল ও এফডিআরের অর্থ একত্র করে মোট স্থিতির হিসাব তুলে ধরেছেন, যা ব্যবহারযোগ্য নগদ তহবিলের প্রকৃত চিত্র নয়। তিনি আরও জানান, দায়িত্ব ছাড়ার আগে ৩৬টি ঠিকাদারি বিল অনুমোদন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৪২ কোটি টাকা পরিশোধের দাবি উঠেছে এবং এসব নথি যাচাই করা হচ্ছে।
ডিএনসিসির আর্থিক অবস্থার সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, কয়েক বছর আগেও করপোরেশন আয়-ব্যয়ের হিসাবে উদ্বৃত্তে ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা এবং ব্যয় হয় ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা। ফলে বছর শেষে উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৯৫ কোটি টাকা।
তবে পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ওই বছর মোট আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা, কিন্তু ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। ফলে প্রায় ২৬০ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এ সময়ে আয় হয়েছে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা, কিন্তু ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮১১ কোটি টাকা, অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হয়েছে প্রায় ৬১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সিটি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধারাবাহিকভাবে ব্যয় যদি আয়ের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। তিনি পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষ অডিটের মাধ্যমে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) হিসাবেও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যয়ের চাপ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয়-ব্যয় শেষে প্রায় ৮২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু পরের অর্থবছরে আয়ের তুলনায় প্রায় ১০২ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় আয় বাড়লেও ব্যয় বেড়ে প্রায় ২০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
মন্তব্য করুন
