

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ই-কমার্স বাজারে বিনিয়োগ বন্ধ করছে চীনের সবচেয়ে বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলিবাবা। এতে বিপাকে পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তারই প্রভাব হিসেবে কঠিন সময় পার করছে দারাজ বাংলাদেশ।
২০১৮ সালে বাংলাদেশসহ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার ও পাকিস্তানব্যাপী কার্যক্রম থাকা দারাজ গ্রুপকে কিনে নেয় জ্যাক মা’র আলিবাবা। আর এখন এই সব কটি দেশেই নিজেদের বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের মতে, দারাজ বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে আলিবাবা।
ই-কমার্সের বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক বাজার নিয়ে কাজ করা একাধিক সূত্রের মতে, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে নিজেদের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে আলিবাবা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেটা’কে ক্লাউডসহ এআইভিত্তিক বিভিন্ন সেবা দিতে ইতোমধ্যে চুক্তিও করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর অংশ হিসেবে হংকংয়ে ১২০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের অবকাঠামো তৈরি করছে আলিবাবা।
উপরন্তু খুচরা পর্যায়ের ই-কমার্স থেকে সরে এসে ‘সরবরাহকারী’ ভিত্তিক ই-কমার্স মার্কেটপ্লেস গড়ে তুলতে অধিক মনোযোগ দিচ্ছে আলিবাবা। খুচরা বিক্রির পাশাপাশি আলিবাবার আরও দুটি ব্যবসা হলো স্থানীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সেতুবন্ধ করা (বিটুবি) এবং ক্রসবর্ডার ই-কমার্সে পণ্য কেনাবেচা করা।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলিবাবা জানায়, ভবিষ্যতে বিটুবি ব্যবসায় বেশি মনোযোগী হবে প্রতিষ্ঠানটি। তারই অংশ হিসেবে খুচরা কেনাকাটা নয় বরং বাংলাদেশকে সোর্সিং হাব হিসেবে দেখছে আলিবাবা। ই-কমার্সের বাজারে আলিবাবার ব্যবসায়িক ধরনের এই পরিবর্তন দারাজে বিনিয়োগ বন্ধের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।
দারাজের একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যয় হ্রাসের নীতিতে চলছে দারাজ। এ জন্য পাকিস্তান ও নেপালের প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) ইতোমধ্যে ছাঁটাই করেছে আলিবাবা। দারাজ বাংলাদেশের সিইও বেন কিয়ান ই বাংলাদেশের পাশাপাশি এই দুই বাজার দেখভাল করবেন। সর্বোচ্চ পর্যায়ের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সব পর্যায়ের কর্মী ছাঁটাই করছে আলিবাবা। এর অংশ হিসেবে দারাজ বাংলাদেশের অপারেশন থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে, সাবেক ও বর্তমান কর্মীরা বলছেন, চলতি বছরের শুরুর তুলনায় গত ঈদুল আজহার আগে দারাজ বাংলাদেশের কর্মী অন্তত ৪০ শতাংশ কমানো হয়েছে। কর্মী ছাঁটাইপ্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে বিদ্যমান কর্মীরাও আছেন আতঙ্কে। অনেকেই খুঁজছেন কর্মসংস্থানের বিকল্প পথ। দারাজ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বেতন বকেয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিষ্ঠানটির মধ্যম সারির এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ম্যানেজার থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের মে মাসের বেতন বকেয়া ছিল। গত সপ্তাহের শেষ দিকে এসে বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যারা বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পান, সেগুলো এখনও অপরিশোধিত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ভাড়ার চুক্তিতে গাড়ি দেওয়া ব্যবসায়ীদের কয়েক মাসের বিল আটকে আছে।’
অন্যদিকে চাকরিচ্যুত কর্মীদের প্রস্তাব করা বিভিন্ন সুবিধা এখন পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তেমন এক কর্মী বলেন, ‘ছয় মাসের কম হলেও দারাজে সব সময় কর্মীদের ঈদের বোনাস দেওয়া হতো। আনুপাতিক হারে হলেও দেওয়া হতো। মেয়াদকাল ছয় মাস হয়নি, এমন কর্মীদেরও ঈদুল ফিতরের বোনাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবার ঈদুল আজহার আগে বড় সংখ্যায় কর্মী ছাঁটাই হয়। তাদের বোনাস দেওয়া হয়নি। শুধু বেতন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ছাঁটাই করা কর্মীদের বিভিন্ন পাওনা যেমন গ্র্যাচুইটি, নোটিশ পিরিয়ডের বেতন ইত্যাদি এখনও দেওয়া হয়নি। দারাজের মতো একটি প্রতিষ্ঠান এমন করবে, কর্মীরা কল্পনাও করেনি।’
সম্প্রতি প্রধান কার্যালয় থেকে দারাজ বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে ভবিষ্যতে আর বিনিয়োগ বাড়াবে না আলিবাবা। অর্থাৎ দারাজ বাংলাদেশকে নিজেদের অর্জিত আয় দিয়েই চলতে হবে। আগামী প্রান্তিকের (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) মধ্যে ‘ব্রেক ইভেন’ (লাভ ক্ষতি সমান সমান) আসতে না পারলে কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয়ে আলিবাবা আর কোনো ভর্তুকি দেবে না। ইতোমধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অর্থে মেটানো হচ্ছে দারাজ বাংলাদেশের ব্যয়।
প্রধান কার্যালয়ের এমন সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশসহ অন্যান্য বাজারেও ‘ব্রেক ইভেন’ এ পৌঁছাতে জোর চেষ্টা করছে দারাজ। এ জন্য ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ছাঁটাই করা হচ্ছে কর্মী। বর্তমানে দারাজে প্রায় এক হাজার কর্মী কাজ করছেন, যাদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৩০০ জন দারাজের নিয়মিত কর্মী। বাকিরা (যেমন ডেলিভারি রাইডার) চুক্তিভিত্তিক আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্স কর্মী। যদিও এই সংখ্যা আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে দারাজ বাংলাদেশের। পাশাপাশি রাজধানীর বনানীতে থাকা দারাজ কার্যালয়ের চারটি ফ্লোর থেকে দুটি ইতোমধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তেজগাঁওসহ দেশজুড়ে থাকা দারাজের বিভিন্ন অফিস, হাব এবং সর্টিং সেন্টারও ছেড়ে দিয়েছে দারাজ বাংলাদেশ। ব্যয় মেটাতে গাজীপুরের কালিগঞ্জ উপজেলার উলুখোলায় থাকা দারাজের মালিকানাধীন একটি জমিও বিক্রির চেষ্টা চলছে।
শুধু তা-ই নয়, দারাজের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা মার্চেন্টদের সিংহভাগ পেমেন্টও বাকি। এ জন্য মার্চেন্টদের একটি অংশ নিয়মিত পণ্য দিচ্ছেন না দারাজে। বেতন-ভাতা না পাওয়ায় ডেলিভারি ও লজিস্টিক্স কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্মীদের একটি অংশ সম্প্রতি কর্মবিরতি পালন করেছে দারাজে। এতে পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের অচলাবস্থা দেখা দেয়। এই বিভাগের এক কর্মী জানান, গত মাসের ১৫ তারিখের অর্ডার, ২৯ তারিখেও ডেলিভারি হয়নি।
দারাজের উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন, ব্রেক ইভেনে আসতে অর্থাৎ নিজেদের আয়ে ব্যয় মেটাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে দারাজ বাংলাদেশ। তবে তাদের আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কাজেই এই সময়ের মধ্যে স্বাবলম্বী না হলে বন্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না দারাজের সামনে। তবে বন্ধের ক্ষেত্রে ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ নিতে পারে দারাজ বাংলাদেশ। কার্যক্রম সরাসরি ‘বন্ধ’ না করে নিজেদের বিভিন্ন সম্পদ ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ‘লিজ’, ‘আউটসোর্সিং’ বা ভাড়ায় দিতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তেজগাঁও’তে দারাজের একটি সর্টিং সেন্টার আছে। সেটা হয়তো কোনো ডেলিভারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়ে দিল। দারাজে যেহেতু অনেক অর্ডার আসে, গ্রাহকদের আস্থা আছে; অন্য কোনো বিনিয়োগকারীর সঙ্গে ‘মার্জ’ (একীভূতকরণ) করল বা কোন ধরনের পার্টনারশিপ করল। তবে দারাজের বাংলাদেশের যেহেতু আর কোনো বিনিয়োগকারী নেই, তাই আলিবাবা বিনিয়োগ বন্ধ করে দিলে, কার্যত দারাজ বাংলাদেশ বন্ধ হয়ে যাবে।’
এসব বিষয়ে দারাজ বাংলাদেশের বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার এ এইচ এম হাসিনুল কুদ্দুসের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে তিনি দেশের বাইরে আছেন।
তবে দারাজের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে দেওয়া মন্তব্যে আলিবাবার বিনিয়োগ বন্ধের তথ্যকে ভিত্তিহীন বলা হয়েছে। দারাজ বলছে, ‘এমন কোনো তথ্য থাকলে আমরাই গণমাধ্যমকে জানাব।’
সূত্র: এশিয়া পোস্ট