মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষকরা

ধানের দাম কম, উৎপাদন খরচ বেশি

সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম
ফাইল ছবি
expand

ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। একসময় কৃষকের প্রধান পেশাই ছিল ধান চাষ। বছরের পর বছর জমিতে ধান ফলিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা, পারিবারিক খরচ মেটানো এবং কিছু টাকা সঞ্চয় করতেন কৃষকরা। সেই সঞ্চয় দিয়ে নতুন জমি কিনতেন কিংবা অন্যের জমি লিজ নিতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও ধানের দাম সে তুলনায় না বাড়ায় ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক কৃষক।

সম্প্রতি সখীপুর উপজেলার ছিলিমপুর, বেতুয়া, বড়চওনা, কচুয়া, নিশ্চিন্তপুর, আড়াইপাড়া, কীর্ত্তনখোলা, পাথারপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

কৃষকরা জানান, ধান চাষে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ, হালচাষ, ধান কাটা-মাড়াই এবং কৃষি শ্রমিকের মজুরিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদিত ধান বিক্রি করে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে কয়েক মাসের পরিশ্রম শেষে অনেক কৃষক ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না।

বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে কৃষি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের ভোগান্তি আরও বাড়ে। ধান পাকার পর সময়মতো শ্রমিক না পেলে জমিতে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার বেশি মজুরি দিয়ে শ্রমিক নিতে গেলে বেড়ে যায় উৎপাদন খরচ।

উপজেলার কচুয়া গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, “আগে ধান চাষ করে মৌসুম শেষে কিছু লাভ থাকত। এখন সার-বিষ কিনতে বেশি টাকা লাগে, শ্রমিকের মজুরি বেশি, সেচ ও অন্যান্য খরচও বেড়েছে। কিন্তু ধান বিক্রি করতে গেলে ভালো দাম পাওয়া যায় না। সব খরচ বাদ দিলে কৃষকের হাতে কিছুই থাকে না।”

তিনি আরও বলেন, “ধান চাষের জন্য অনেক সময় ধার-দেনা করতে হয়। আশা থাকে ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করব। কিন্তু ধানের দাম কম থাকায় অনেক সময় পুরো ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। বছর শেষে লাভের বদলে ঋণের বোঝা টানতে হয়।”

আড়াইপাড়া এলাকার কৃষক আ. মান্নান বলেন, “বাজারে ধানের দাম কম থাকলেও চালের দাম তুলনামূলক বেশি। কৃষক তার উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই ক্ষেতে ধান চাষ কমিয়ে দিয়েছি। নিজের খাবারের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই রোপণ করি। বাকি জমি পতিত রাখছি এবং দুইটি জমি বর্গা দিয়েছি।”

উপজেলার কচুয়া ও বড়চওনা ধানের বাজারে গিয়ে দেখা যায়, নাজিরসাইল ধান মণপ্রতি ১৩০০ থেকে ১৩৪০ টাকা এবং আটাশ ও উনেত্রিশ ধান মণপ্রতি ১১৪০ থেকে ১১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

বড়চওনা বাজারের কৃষক বিল্লাল হোসেন ধান নিয়ে বাজারে এসে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন—আশা ছিল হয়তো দাম কিছুটা বাড়বে। তবে দাম না বাড়ায় শেষ পর্যন্ত চলমান দামেই ধান বিক্রি করে বাড়ি ফিরে যান তিনি।

কৃষক আবুল হোসেন বলেন, “ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বেশি কৃষক ধান চাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবেন। এতে কৃষকের জীবন-জীবিকার পাশাপাশি দেশের খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিয়ন্তা বর্মন জানান, উপজেলার অধিকাংশ জমিতেই মৌসুমভেদে কোনো না কোনো ফসলের আবাদ হচ্ছে। কেউ ধানের পরিবর্তে গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে কোনো কোনো কৃষক নির্দিষ্ট মৌসুমে জমিতে চাষাবাদ করতে পারেন না। সেচের সমস্যাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত কারণে এক-দুজনের জমি সাময়িকভাবে অনাবাদি থাকতে পারে।

ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেললে কৃষি বিভাগের কোনো উদ্বেগ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কোনো কৃষক ধান চাষ করে ন্যায্যমূল্য না পেলে তিনি বিকল্প অন্য কোনো ফসল চাষ করতে পারেন।”

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank