

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মা, আমি সুমাইয়াকে কোলে নিতে পারব কবে। মা, আমি কি আবার আগের মতো হাঁটতে পারব। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন তিন মাস আগে সিজারিয়ান অপারেশন করানো সাথী খাতুন। চিকিৎসকের অবহেলায় তিনি এখন কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের হরি নারায়ণপুর গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে সাথী খাতুনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, আলেয়া হাসপাতালে চিকিৎসক ডা. রুহুলের মাধ্যমে সিজারিয়ান অপারেশন করানোর পর থেকেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
সাথী খাতুন বলেন, সিজারের দেড় মাস পর আমার জরায়ু দিয়ে মাংসের টুকরোর সঙ্গে প্রায় দুই ফুট সুতা বের হয়েছে। আমি গরিব মানুষ, আর এই কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। আমাকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে।
সাথীর মা ফুলমালা জানান, সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য আলেয়া হাসপাতালে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অপারেশনের পর থেকেই তার মেয়ের জরায়ু দিয়ে রক্তক্ষরণ চলতে থাকে। পরে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে দুর্গন্ধের কারণে রোগীর কাছে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
মুঠোফোনে সাথীর স্বামী আমজাদ জানান, কয়েকবার আলেয়া হাসপাতালে নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দেড় মাস চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা বাবদ প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
তিনি বলেন, সবকিছু বিক্রি করেও চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারিনি। সংসার চালানোর উপায় না পেয়ে এখন ঢাকায় রিকশা চালাচ্ছি। আমার তিনটি ছোট সন্তান রয়েছে। আমি এই ঘটনার বিচার চাই।
সিজারের সময় রোগীর সঙ্গে থাকা প্রতিবেশী হোসেন সেখ জানান, গত ২ এপ্রিল আলেয়া হাসপাতালের এক দালাল রিপনের পরামর্শে সাথীকে সেখানে নেওয়া হয়। অপারেশন করতে চিকিৎসকের প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে হাসপাতালের লোকজন হুমকি-ধমকি দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হোসেন সেখ আরও জানান, অপারেশনের রাতেই রোগীর পেট ফুলে যায়। এরপরও তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। বাড়িতে যাওয়ার পর জরায়ু দিয়ে পুঁজ ও তরল পদার্থ বের হতে থাকে এবং রোগী অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকেন। পরে ৯ এপ্রিল আবার আলেয়া হাসপাতালে নেওয়া হলে নাক দিয়ে পাইপ প্রবেশ করিয়ে পেটের ফোলা কমানো হয়। কিছু ওষুধ দিয়ে পুনরায় বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে দ্রুত জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জরায়ু দিয়ে মাংসের টুকরোর সঙ্গে প্রায় দুই ফুট সুতা বের হওয়ার বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. রুহুলের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুতা বের হয়েছে, ভালো হয়েছে। সুতা বের হতেই পারে। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেন, রোগী তো সিরাজগঞ্জ শহরের মানুষ না। তারা হয়তো আর এখানে আসবে না। কিন্তু আপনাদের তো সিরাজগঞ্জ শহরে থাকতে হবে। বিষয়টি মাথায় রাখবেন।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, জরায়ু দিয়ে এভাবে মাংসের টুকরোর সঙ্গে দুই ফুট সুতা বের হওয়ার কথা নয়। যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে এবং লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা মিললে অবশ্যই আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, এর আগেও বিভিন্ন অনিয়মের কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটিকে তিনবার জরিমানা করা হয়েছে।
বর্তমানে সাথী খাতুন শয্যাশায়ী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসা ব্যয়ে নিঃস্ব পরিবারটি এখন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।