বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
পটুয়াখালীতে ভাঙন রোধে ব্যর্থ পাউবো

ঠিকাদারের দ্বন্দ্বে আড়াই বছরেও শেষ হয়নি সংরক্ষণ প্রকল্প

মাহমুদ হাসান, পটুয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
ছবি: এনপিবি নিউজ
expand
ছবি: এনপিবি নিউজ

পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলায় পায়রা নদীর প্রবল ভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি। ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নেওয়া জরুরি সংস্কার প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের পরও আড়াই বছরে শেষ হয়নি। এর মধ্যেই গত এক বছরে শতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে রাস্তার পাশে ঝুপড়ি তুলে বা ঝুঁকিপূর্ণ আবাসনে আশ্রয় নিয়েছে। আগের বছরগুলোতে এমন ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে আরও প্রায় দুই শতাধিক পরিবারকে।

গত ১৫ জুন উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পায়রার তীরঘেঁষা এই গ্রামের অনেক বসতবাড়ি ও ফসলি জমি ইতিমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। যেসব স্থাপনা এখনও টিকে আছে, ভাঙন এড়াতে সেগুলোও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ভাঙা ঘরের মালামাল দিয়ে রাস্তার পাশে অস্থায়ী ঝুপড়ি বানিয়ে দিন কাটাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।

বসতঘর হারিয়ে একমাত্র সন্তান নিয়ে সরকারি আবাসনে থাকছেন মোসা. লাভলী বেগম (৩৫)। এক বছর আগে ক্যানসারে স্বামীর মৃত্যুর ছয় মাসের মাথায় তাঁর ঘরও নদীতে বিলীন হয়ে যায়। পরিবারে উপার্জনক্ষম আর কেউ না থাকায় তিনি এখন চরম অসহায় অবস্থায় আছেন। একই আবাসনে থাকা মো. রুবেল হাওলাদার (৪২) জানান, ২০২১ সালে তাঁর ঘর নদীতে বিলীন হওয়ার পর থেকে পরিবার নিয়ে সরকারি আবাসনেই থাকতে হচ্ছে তাঁকে। এক বছর আগে ঘর হারিয়ে একই আবাসনে আশ্রয় নিয়েছেন ট্রলারচালক মো. অলিউল্লাহও।

পায়রার তীরে বসতভিটা হারিয়ে শতবর্ষী মো. দলিল উদ্দিন ফকির এখন পরিবার নিয়ে রাস্তার পাশে ঝুপড়িতে দিন কাটাচ্ছেন। গত বছরের অক্টোবরে তাঁর ঘর বিলীন হয়েছিল। একই দশা ট্রলার শ্রমিক জাকির হোসেনের (৪০)। দুই বছর আগে একবার ঘর হারানোর পর নতুন জায়গায় ঘর তুলেছিলেন তিনি, কিন্তু গত অক্টোবরে সেটিও নদীতে চলে যায়। হতাশ কণ্ঠে জাকির বলেন, এখন জমি কেনা বা ঘর তোলার সামর্থ্য নেই, তাই পুরোনো ঘরের মালামাল নিয়ে রাস্তার পাশে ঝুপড়িতেই থাকতে হচ্ছে।

আঙ্গারিয়া বাজারের পান-সুপারি বিক্রেতা বিনয় চন্দ্র পাইকেরও (৭০) পৈতৃক ভিটা গত অক্টোবরে নদীতে চলে গেছে। আগে তিনবার তাঁর ঘর ও জমি নদীগর্ভে যাওয়ার পর এবার আর্থিক সংকটে পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে বাজারে ভাড়া বাসায় উঠতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য কবীর সিকদারের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুনে পাউবো জিওব্যাগে বালু ভরে ভাঙন রোধের কাজ শুরু করলেও ঠিকাদার সেগুলো ফেলে রেখে যান, পরে আর স্থাপন করা হয়নি। সময়মতো জিওব্যাগ বসানো হলে এত পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতো না বলে মনে করেন তিনি। তাঁর হিসাবে, গত পাঁচ বছরে বাহেরচর গ্রামের প্রায় ৫০০ একর জমি নদীতে বিলীন হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাড়ে তিনশ থেকে চারশ পরিবার। যাদের সামর্থ্য আছে তারা অন্যত্র ঘর তুলেছেন, যাদের নেই তারা উদ্বাস্তু জীবন বেছে নিয়েছেন। কবীর সিকদার সতর্ক করেন, বাহেরচর বাজার ও আশপাশে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা রয়েছে এখনই ভাঙন না ঠেকালে চলতি বর্ষায় এসব স্থাপনা রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

পটুয়াখালী পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাহেরচর গ্রামে পায়রার ভাঙন রোধে জরুরি সংস্কার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে ৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকার কার্যাদেশ পায় "শহিদ-খুশি" নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এক বছর মেয়াদি এই প্রকল্প ২০২৫ সালের মে মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২৬ মাস পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। সরেজমিনে দেখা গেছে, ভাঙনকবলিত প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে রাখা হয়েছে, যা এখনও স্থাপন করা হয়নি।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, মূল ঠিকাদার ও সাব-ঠিকাদারের দ্বন্দ্বের কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকবার নোটিশ দিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হলেও ঠিকাদারের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, আগের ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কাজ শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Bosnia-Herz VS Qatar
Scheduled
25 Jun, 01:00 AM
VS
World Cup