বৃহস্পতিবার
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পা দিয়ে লিখেই মাস্টার্স, চাকরি পেতে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চাইলেন শারমিন

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২০ পিএম
দুই হাত অকেজো, পা দিয়ে লিখেই মাস্টার্স অবধি লেখাপড়া করেছেন শারমিন।
expand
দুই হাত অকেজো, পা দিয়ে লিখেই মাস্টার্স অবধি লেখাপড়া করেছেন শারমিন।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের বাসিন্দা শারমিন আলম নিপু। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্ম নেওয়া শারমিনের দুই হাতই অকেজো। হাত দিয়ে কোনো কিছু ধরতে পারেন না, নেই কোনো শক্তিও। তবে এই প্রতিবন্ধকতা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। পা দিয়ে লিখেই স্কুল-কলেজের সব পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। নোয়াখালী সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগ থেকে ২০২২ সালে মাস্টার্স পাস করেছেন। তার স্বপ্ন একটাই-একটি সরকারি চাকরি।

শারমিন পা দিয়ে লিখেই ৪৯তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, প্রতিবন্ধী কোটায়। তবে ফলাফল তার পক্ষে আসেনি। ফলে সরকারি চাকরির স্বপ্ন এখনও অধরা। চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা শেষ হতে তার হাতে সময় আছে আর মাত্র চার মাস।

এ অবস্থায় অনন্যোপায় শারমিন এখন প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চান। তার আকুতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সক্ষমতা বিবেচনা করে যেন তাকে একটি সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর রাজগঞ্জ ইউনিয়নের গরিব কৃষক ফিরোজ আলমের মেয়ে শারমিন। স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে নোয়াখালী সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগ থেকে ২০২২ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে শারমিন সবার বড়। তার বাবা ফিরোজ আলম একজন দরিদ্র কৃষক। নিজেদের সামান্য জমি রয়েছে। মা বকুল বেগম গৃহিণী।

একটি সরকারি চাকরির আকুতি জানিয়ে শারমিন আলম নিপু বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সরকারি অফিসার হওয়ার স্বপ্ন আমার। এ কারণে পা দিয়ে লেখালেখির চর্চা করেছি। সবাই যেভাবে হাতে লিখতে বা টাইপ করতে পারে, আমিও তা পা দিয়েই অনায়াসে করতে পারি। পা দিয়ে লিখেই মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। এভাবেই আমি আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছি। এখন শুধু একটি চাকরি দরকার।’

তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন, আমাকে একটি সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়া হোক। চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা শেষ হতে আমার আর মাত্র চার মাস বাকি।’

প্রতিবন্ধী হওয়ায় চাকরি পেতে সমস্যার মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ শারমিনের। তিনি বলেন, ‘আমি নোয়াখালী থেকে ঢাকায় গিয়ে অনেক সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। অর্থ ব্যয় করেছি, কষ্ট করে পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু কোনো ফল হয়নি।’

শারমিনের কণ্ঠে তখন ছিল অভিমানের সুর। তিনি বলেন, ‘চাকরির আবেদন করি, পড়াশোনা করি, পরীক্ষা দিই। কোনো কোনো পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হই। কিন্তু পরে আর ডাকা হয় না। এভাবেই চলছে আমার জীবন।’

শারমিন জানান, ২০২৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার লিখিত ধাপে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাকে চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমনকি মৌখিক পরীক্ষার জন্যও ডাকা হয়নি।

শারমিন বলেন, ‘আমি এখন বাঁচতে চাই। একটি সরকারি চাকরি চাই। আমি অশিক্ষিত নই, অযোগ্যও নই।’

কোথাও চাকরি না পেয়ে বর্তমানে বেগমগঞ্জে নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছেন শারমিন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে তার পরিবারে চলছে চরম অসচ্ছলতা।

মেয়ের একটি চাকরি হলে সংসারের অনটন অনেকটাই দূর হতো বলে জানান শারমিনের বাবা কৃষক ফিরোজ আলম। তিনি বলেন, ‘আমি গরিব কৃষক। সবসময় অভাব-অনটনের মধ্যে থাকি। এমন অবস্থার মধ্যেও কৃষিকাজ করে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছি। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ায় মেয়েটার কোনো চাকরি হচ্ছে না। আমরা কোনো সহায়তা বা ভিক্ষা চাইছি না। আমার মেয়ে উচ্চশিক্ষিত। এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি আমার মেয়েকে একটি সরকারি চাকরির সুযোগ দেন, তাহলে মৃত্যুর পরও শান্তি পাব।’

স্থানীয়রা জানান, শারমিন ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তিনি মেধাবীও। পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পাস করেছেন। তার একটি চাকরি হলে পরিবারটি ঘুরে দাঁড়াতে পারত।

তারা আরও জানান, শারমিনের বাবা দরিদ্র কৃষক। এর ওপর তিনি অসুস্থ। পরিবারের একমাত্র ভাই বিদেশে গেলেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। বরং পরিবারটির ওপর রয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকার ঋণের বোঝা।

এর আগে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর দেশের একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে শারমিন আলম নিপুকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘দুই হাত অকেজো, পা দিয়ে লিখে বিসিএস পরীক্ষা দিলেন শারমিন’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, সেদিন ৪৯তম বিশেষ বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের সামনে ফুটপাতে বসেছিলেন শারমিন। অন্য পরীক্ষার্থীদের তুলনায় তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা।

পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের আগে ফুটপাতে বসেই শারমিন দেখিয়েছিলেন, তিনি পা দিয়ে লিখতে পারেন। এমনকি পা দিয়েই ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখে নিজের মনের কষ্টের কথাও জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাঁকে যেন একটি চাকরি—বিশেষ করে সরকারি চাকরি—দেওয়া হয়।

বিষয়টি নজরে এলে প্রতিবেদক তার সঙ্গে কথা বলেন। সেদিন পরীক্ষার হলে বেঞ্চের ওপর দুই পা তুলে ডান পা দিয়ে লিখে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন শারমিন।

শারমিনের জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রমাণ করে, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এখন তার প্রত্যাশা, যোগ্যতা ও সক্ষমতার মূল্যায়ন করে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়াবে এবং একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন