সোমবার
০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হাতিয়ায় শুঁটকি মহাল, নোনা বাতাসে পিষ্ট শৈশব

নোয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:১৮ পিএম
হাতিয়ার চরাঞ্চলে রোদে শুকানো হচ্ছে শুটকি
expand
হাতিয়ার চরাঞ্চলে রোদে শুকানো হচ্ছে শুটকি

প্রখর রোদে তপ্ত বালু আর নোনা বাতাসের গন্ধ; এই দুইয়ে মিলে এখন অন্যরকম এক ব্যস্ততা নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায়। সাগরের নোনা জল থেকে উঠে আসা রুপালি মাছের সারি এখন উপকূলের মাঠগুলোতে।

উপজেলার রহমত বাজার থেকে নিঝুমদ্বীপ-সবখানেই এখন চলছে শুঁটকি উৎপাদনের ধুম। তবে এই রূপালী অর্থনীতির আড়ালে ডানা মেলছে এক শঙ্কা। একদিকে যেমন নির্বিচারে পোনা মাছ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে শৈশব বিসর্জন দিয়ে রোদে পুড়ছে শত শত শিশু।

​সরেজমিনে হাতিয়ার রহমত বাজার গোলপাতা পর্যটন এলাকা, কাজিরবাজার, জঙ্গলিয়া এবং জাহাজমারা এলাকা ঘুরে দেখা যায় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। সূর্য ওঠার আগেই জেলেরা নদী ও সাগর থেকে নিয়ে আসছেন ছোট চিংড়ি, রেণু মাছ এবং চেউয়া। ভোরের আলো ফুটতেই সেই মাছ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বাঁশের মাচা কিংবা খোলা বালুচরে।

​স্থানীয় জেলেরা জানান, এটি তাদের দীর্ঘদিনের পেশা। বছরের নির্দিষ্ট এই সময়ে মাছের আধিক্য থাকায় তারা বাড়তি আয়ের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করেন।

বড় বড় চেউয়া মাছ কেজি প্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও, ছোট আকৃতির মাছগুলো রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হচ্ছে শুঁটকি। যা মূলত মাছ চাষের ফিড ও পশু খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

​এই শুঁটকি মহালগুলোর সবচেয়ে উদ্বেগজনক দৃশ্য হলো শিশুদের উপস্থিতি। যে বয়সে হাতে থাকার কথা ছিল পাঠ্যবই, সেই বয়সে তপ্ত রোদে মাছ উল্টে-পাল্টে দিচ্ছে ১০-১২ বছরের শিশুরা।

১২ বছরের সোহেল এবং ১০ বছরের আলিফ। তারা দুজনেই নবীর মাঝির অধীনে কাজ করে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনির পর মাস শেষে তাদের হাতে জোটে মাত্র ৫ হাজার টাকা।

তাদের মতো করে রিপন ও সাইফুল মাত্র ৬ থেকে ৭ বছর বয়সী এই দুই শিশু দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছে।

​সচেতন মহলের মতে, শুঁটকি তৈরির জন্য যেভাবে নির্বিচারে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রেণু ও চিংড়ি আহরণ করা হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, এই রেণুগুলোই বড় হয়ে পূর্ণাঙ্গ মাছে পরিণত হওয়ার কথা ছিল। এগুলো এখন শুঁটকি করে ফেলায় ভবিষ্যতে নদী ও সাগরে মাছের আকাল দেখা দিতে পারে।

​হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ফয়জুর রহমান বলেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। শুঁটকি উৎপাদকরা যদি এগিয়ে আসে, তবে আমরা তাদের আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাছ শুকানোর প্রশিক্ষণ দেব। এতে কেমিক্যালমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন নিশ্চিত হবে এবং পরিবেশের ক্ষতি কমবে।’

​পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব হাতিয়ার এই সম্ভাবনাময় খাতটিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে যেমন শিশু শ্রম বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন, অন্যদিকে মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। যদি এখনই রেণু মাছ নিধন বন্ধ করা না যায় এবং শিশুদের স্কুলের পথ দেখানো না হয়, তবে এই তাৎক্ষণিক মুনাফা ভবিষ্যতে দ্বীপবাসীর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন