

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাংলাদেশের উত্তরের ভূপ্রান্ত ধরে বয়ে চলা তিস্তা নদী শুধু একটি নদী নয়, একটি জীবন্ত অধ্যায়। খড়স্রোত অববাহিকায় তিস্তা কখনো হাসায় -আবার কখনো কাঁদায়। শান্ত নীল জলরাশি আর তার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ফসলেরক্ষেত, গাছগাছালির মাঝে দিয়ে বয়ে চলা এই নদী যেন প্রকৃতির এক চিরন্তন কবিতা।
কিন্তু এই কবিতার মাঝে আছে কিছু ছেঁড়া ছন্দ, কিছু অপ্রত্যাশিত বাঁক। কখনো সে মায়াময় হাসি নিয়ে বয়ে চলে, আবার হঠাৎ রুদ্ররুপে আছড়ে পড়ে মানুষের জীবন ও জীবিকায়। তিস্তার গল্প শুধু নদীর গল্প নয়-এটি একটি জাতির স্বপ্ন , সংকট আর সংগ্রামের গল্প।
তিস্তাকে বলা হয় - নীল জলরাশি। পাহাড়ি অঞ্চলের বুক চিরে নেমে আসা এই তিস্তা নদী যখন শান্ত থাকে, তখন সে আশীর্বাদ হয়ে উঠে। কৃষকরা জমিতে নেয় সেচ সুবিধা , জেলেরা মাছ শিকার করায় নদী পারের মানুষদের জীবনে এনে দেয় সজীবতা। আর শুস্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর পানি যখন শুকিয়ে যাওয়ায়, তিস্তার বুক তখন পরিণত হয় ধু-ধু বালুচরে। পানি অভাবে কৃষকরা বঞ্চিত হয় সেচ সুবিধা থেকে।
তবে প্রকৃতি সবসময় স্নেহময়ী থাকে না। বিশেষ করে বর্ষাকালে। উজানের পাহাড়ী ঢলে আর অতি বৃষ্টির কারণে তিস্তা রূপ নেয় এক ভয়ংকর রাক্ষুসী রুপে। নদীর পানি হঠাৎ করে বেড়ে গিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, পুকুরের মাছসহ শেষ সম্বলটুকুও। প্রতিবছর উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা জেলাগুলোতে বন্যার ঝুঁকি থেকে যায়।
শুস্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষকরা পড়ে সেচ সংকটে। তিস্তা পাড়ের ষাটউর্দ্ধ বৃদ্ধা জয়নাল বলেন, তিস্তা কখনো আশীর্বাদ, আবার কখনো অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। জ্ঞানবোধ হবার পর থেকেই তার বসতভিটা তিস্তা গিলেছে ১৪ বার।
এখন সে নিঃস্ব। এ যেন জমিদাড়ীর কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি। সর্বস্ব হারিয়ে ডান তীর বাঁধে আশ্রয় নিয়ে কোন রকম দিন কাটছে তার। ছিলো গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ। এখন সব কিছুই যেন স্বপ্ন তার।
তিস্তা নদীর পানি শুধু বাংলাদেশের নয়, ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ৬ জেলার দিয়েও প্রবাহিত। ফলে এর পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে আলোচনার পর আলোচনা।
২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তা আজও ঝুলে আছে। এতে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষি ও জীবিকা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ চায় ন্যায্য হিস্যা, যাতে সারা বছর তিস্তার পানি ব্যবহার করা যায় কৃষি ও মানুষের জন্য।
কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনে এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি বারবার আলোচনার টেবিলে পড়ে থাকছে। যদিও ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে একটি পানিবন্টন চুক্তি হয়। আর এই চুক্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছিলো- শতভাগ পানির মধ্যে ৩৯ ভাগ ভারত, ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ আর বাকি ২৫ ভাগ পানি থাকবে নদীর স্বাভাবিক গতি প্রবাহ ঠিক রাখতে।
কিন্তু বারংবার বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক বিষয়টি উস্থাপিত হলেও বাস্তবিক অর্থে তিস্তা চুক্তিটি আজও আলোর মুখ দেখেনি। আর এর প্রভাব পড়েছে তিস্তার পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা জীবন-জীবাকার আস্তানায়।
যাদের দিন কাটে নদীর পাড়ের কাঁদা-মাটি ও বালুর সাথে। তিস্তার বুকে জেলেরা মাছ ধরে, কৃষকরা জমি চাষাবাদ করে জীবন-জীবিকার সংগ্রামে দিন কাঁটায়।
তবে নদীভাঙন, সেচসংকট, জলাবদ্ধতা আর বন্যার ভয়ে তিস্তা তাদের প্রিয় হলেও, এ যেন ভয়ংকর এক নিয়তি। তিস্তা নদী শুধুই একটি নদী নয়, এটি একটি জীবন্ত ইতিহাসের লীলাভূমি। এ যেন রূপকথার বাস্তব রূপ। তিস্তা বয়ে চলা মানে একদিকে যেমন জীবনের স্রোত; তেমনি অন্যদিকে কান্নার ঢেউ।
তবে তিস্তাকে ঘিরে প্রকৃতি কখনো বন্ধুর মতো, আবার কখনো প্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠে। তিস্তা নিয়ে আলোচনা শুধুই আবেগ নয়; এটি এখন জাতীয় স্বার্থ। তাই সময় এসেছে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিকে জোরালো কণ্ঠে তুলে ধরা। আর তাই তিস্তা মহাপকিল্পনা বাস্তবায়নের কোন বিল্প নেই বলে অভিমত তিস্তা পাড়ের বাসিন্দাদের।
মন্তব্য করুন
