


ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্বল্প খরচে নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুবিধা নিশ্চিত করতে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নের আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে কলাতলা, সরকারের চর ও শুম্ভক হয়ে বাঁশকান্দি ইউনিয়নের বিলপদ্মা নদী পর্যন্ত একটি খাল খনন করা হয়েছিল।
সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় নির্মিত এই খাল স্থানীয় জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। এটি একদিকে বর্ষা মৌসুমের জলাবদ্ধতা দূর করত, অন্যদিকে কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করত। একই সঙ্গে নৌপথে পণ্য পরিবহন সহজ হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিও গতিশীল হয়ে ওঠে।
সুপরিকল্পিত এই জলপথ শুধু বর্ষাকালের স্থায়ী জলাবদ্ধতা দূর করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং শুষ্ক মৌসুমে বিল ও নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যও বাড়াত। প্রকৃতি ও স্থানীয় গণমানুষের জন্য অত্যন্ত উপকারী এই জলপথটি আজ মানচিত্রের জীবন্ত ইতিহাস থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বহেরাতলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বিআরএস রেকর্ড অনুযায়ী এই খালটির অস্তিত্ব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ৪৪ নং বড় বহেরাতলা মৌজার ২ নং শিটের বিআরএস ২২৪৩, ২২৫৩, ২৯৫৫, ৩০০১ ও ৩১৫৬ নং দাগগুলো মূলত আরএস খতিয়ান ৯১৭, ৯১৯, ৯২২, ৯২৯, ৯৩৭, ৯৩৮, ৯৩৯, ৯৪০, ৯৪১, ৯৪২, ১০০৫, ১০৬১ ও ১৩৬২ থেকে আগত। তাছাড়া ৪৫ নং সরকারের চর মৌজার ৩ নং শিটের বিআরএস ২৯০০ নং দাগ, যা আরএস ২৬২১ থেকে এসেছে। আর ৪৫ নং সরকারের চর মৌজার ৪ নং শিটের বিআরএস ৪১৮০ ও ৪১৯৯ নং দাগ, যা আরএস ৪০৯২ ও ৪০৪৬ খতিয়ান থেকে সৃষ্টি হয়েছে।এসব খতিয়ান ভূক্ত জমির উপর দিয়েই মূলত খালটি প্রবাহিত।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সিএস ও আরএস আমলের এই প্রবাহমান খতিয়ানগুলো বর্তমানে ১ নং, ৩ নং ও ৪ নং খতিয়ানভুক্ত (সরকারি খাস জমি), যা সরাসরি জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের অনুকূলে রক্ষিত। অর্থাৎ, আইনত এই খালের মালিকানা জনসাধারণের এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সরকারের। অথচ নকশায় থাকা এই বিশাল জলপথ আজ এক শ্রেণির প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সঠিক তদারকির অভাবে খালের উৎস মুখ (কলাতলা অংশ) বন্ধ করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। কলাতলা গ্রামের আলীমুদ্দিন মুন্সীর বাড়ির দক্ষিণ দিক থেকে খাল পারাপারের নামে নিজস্ব উদ্যোগে কয়েকটি মাটির রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ঝাউকান্দি এলাকায় খাল দখল করে গড়ে উঠছে স্থায়ী স্থাপনা, যা খালটিকে পর্যায়ক্রমে বিলুপ্ত করার অপচেষ্টা মাত্র।
সরকারের চর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা গোলাম ফারুক খালাসি (৬৫) বলেন, "১৯৭৯ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচীর আওতায় এই খালটি পুনঃখনন করা হয়। তখন এটি আবার রূপ নেয় নতুন কৃষি বিপ্লবের ইশতেহারে। আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে বয়ে আসা পলিমাটি দু'পাশের জমিকে করে তুলতো সোনাফলা। পালতোলা নৌকায় কৃষি পণ্য যেতো দূর-দূরান্তের হাটে, আর জেলের জালে ধরা পড়তো ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ। সেই কলতান আজ নিথর, চারপাশ নিস্তব্ধ।"
কলাতলা গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য তারা মিয়া খালাসি (৭৬) আক্ষেপ করে বলেন, "এই খালের স্রোতস্বিনী প্রবাহ চলমান রাখার জন্য আমি ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে খালের উৎস ও শেষ প্রান্তে স্লুইস গেট নির্মাণসহ পুরো খালটি সংস্কারের একটি পরিকল্পনা (স্কিম) জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু নানা কারণে তখন তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এখন সরকার যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় খালটি পুনঃখনন করে, তবে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, বরং আমরা স্বাগত জানাব।"
বহেরাতলা এলাকার বাসিন্দা আঃ মান্নান (৬৩) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আড়িয়াল খাঁ নদের সাথে খালের সংযোগ না থাকায় জোয়ার-ভাটার পানি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জমিতে উর্বর পলি মাটি আসে না। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে জমিতে সেচ দেওয়া যায় না, আবার বর্ষায় অতিবৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত হতে না পেরে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।" তিনি আরও বলেন," দীর্ঘদিন পানি আটকে থাকায় খাল ও বিলের পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং এলাকায় মশা ও পানিবাহিত নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এই চরম ভোগান্তি থেকে এলাকাবাসীকে বাঁচাতে আড়িয়াল খাঁ নদের সাথে সংযোগ স্থাপনপূর্বক খালটি জরুরি ভিত্তিতে পুনঃখনন করা প্রয়োজন।"
সরকারের চরের মো. হাবিবুর রহমান (৬৪)ও ছলেনামা গ্রামের মো. দাদন মুন্সী (৬৮) জানান, "১৯৯৮ সালের বন্যার পর বালু জমে এবং অবৈধ দখলের কারণে খালের উৎস মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে বহেরাতলা দক্ষিণ ও বাঁশকান্দি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ চরম পানিসঙ্কটে ভুগছেন। একসময় যে পাটের জাগ(পাট পচানো প্রক্রিয়া) আমরা অনায়াসে ক্ষেতেই দিতে পারতাম, এখন পানির অভাবে সেই পাট মাথায় করে দূর-দূরান্তের ডোবায় নিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ বাড়ছে, পাটের গুণগত মানও নষ্ট হচ্ছে।"
বিধায় হাজার হাজার মানুষের কষ্ট লাঘবে এই খালটি পুণঃখনন করা অতি জরুরী।
ছলেনামা গ্রামের আঃ জলিল মুন্সী (৬৮) জানান, "কলাতলা থেকে শুম্ভক পর্যন্ত বিস্তৃত এই খালটি যখন সচল ছিল, তখন পলিসমৃদ্ধ মাটিতে উপচে পড়ত ফসল। খালের দুই পাড়ের বিস্তীর্ণ বিল ছিল মৎস্য ভাণ্ডার। পাল তোলা নৌকা আর ট্রলারে পণ্য পরিবহন এবং মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত শত শত পরিবার। কিন্তু খালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আজ সেই চেনা ছবি উধাও হয়ে গেছে। শত শত মানুষ পেশা বদলে বাধ্য হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। খালের সেই পুরনো জৌলুস ফিরিয়ে আনতে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে বাঁচাতে এটি দ্রুত পুনঃখনন করা এখন সময়ের দাবি।"
এই বিষয়ে জানতে চাইলে শিবচর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাইখা সুলতানা বলেন, "আমরা ইতোমধ্যে তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার)-কে নির্দেশনা পাঠিয়েছি। তদন্তে বেদখলকারীর অস্তিত্ব পাওয়া গেলে অবশ্যই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। এছাড়া, সরকারি জায়গা ও পুরাতন খালের সীমানা নির্ধারণ করে সেখানে লাল পতাকা টাঙিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"
অন্যদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান জানান,"খাল খনন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার নির্দেশনায় স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। ইতোমধ্যে পাট কর্মকর্তা ও পিআইও-র সমন্বয়ে জরুরি ভিত্তিতে খননযোগ্য খালগুলো চিহ্নিত করার কাজ চলছে।"
তিনি আরও বলেন, "কলাতলা - সরকারের চর - শুম্ভক খালটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দ্রুততম সময়ে খালটি পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।"