শুক্রবার
১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৯ জুন ২০২৬, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘মৃত ছাগল বলে শিশু নন্দিনীর বস্তাবন্দি মরদেহ পুঁতে রাখে বিধান’

লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ১০:৪৭ এএম
শিশু নন্দিনী
expand
শিশু নন্দিনী

বিস্কুট খাওয়ানোর পরে শিশু নন্দিনীকে গলা টিপে হত্যা করে এবং মৃত ছাগল বলে তার বন্দাবন্দি লাশ দিনের আলোতে পুঁতে রাখে খুনি বিধান চন্দ্র।

আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এমনটাই দাবি করেছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

দ্রুত সময়ে চার্জশিট দাখিল করে এ হত্যাণ্ডের বিচার কার্য সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) দুপুরে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রামে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৭ বছরের শিশু নন্দিনীর বাড়িতে গিয়ে নিহতের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ প্রতিশ্রুতি দেন।

এ সময় মন্ত্রীর সাথে জেলার বাকী দুই সংসদ সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীর কাছে দাবি করেন নন্দিনীর পরিবার।

গত সোমবার বিকেলে প্রাক প্রাথমিক শ্রেণি পড়ুয়া শিশু নন্দিনী রায় নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে পরদিন মঙ্গলবার সকালে নিহতের বাড়ির পাশে একটি ভুট্টা ক্ষেতের মাটি খুড়ে বস্তাবন্দি নন্দিনীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা সন্দেহজনক অভিযুক্ত হিসেবে তাদের প্রতিবেশী বিধান চন্দ্রের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে বিধানকে বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। পাশের আরেকটি বাড়িতে আশ্রয় নেয়া বিধানের বাবা রণজিৎ কুমারকেও আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে।

পুলিশ লাশ ও অভিযুক্তদের নিয়ে ফেরার চেষ্টা করলে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নিতে কয়েক দফায় পুলিশের ওপর আক্রমন চালায়। ঘটনার পরপরেই ঘটনাস্থল তদন্তে আসেন পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান।

একে একে তিনটি থানা ও রিজার্ভ ফোসের পুলিশ, বডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি), আনসার ব্যাটালিয়ন ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ বহরকে তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে বিক্ষুব্ধ জনতা। অবরুদ্ধ থাকেন জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মেহেদী ইমাম ও জেলা পরিষদ প্রশাসক।

অবশেষে পরিস্থিতে কিছুটা স্বাভাবিক করে অভিযুক্তদের নিয়ে ফিরছিল জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় শেষ দফায় তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে বিক্ষুব্ধ জনতা।

এতে এসপি ওসিসহ প্রায় ৩৫-৪০ জন আহত হন। তাদের ছোড়া ইটপাটকেলে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের গাড়িসহ ৭টি গাড়ি ভাঙচুর করে। অবশেষে সাউন্ড গ্রেনেড ছুরে অভিযুক্তদের নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ওই দিন রাতে নিহতের বাবা নলিনী মোহন বাদী হয়ে বিধান চন্দ্র, তার বাবা রণজিৎ কুমার ও মা মমতা রানীর বিরুদ্ধে আদিতমারী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

সে মামলায় বিধান ও তার বাবা রণজিৎ কুমারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বুধবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। গ্রেপ্তার বিধান চন্দ্র হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এতে হত্যার লোমহর্ষক বর্ননা দিয়েছে খুনি বিধান চন্দ্র।

হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনায় বিধান জানায়, কয়েক বছর আগে তার মা মমতা রানী অন্যের সংসারে যাওয়ায় তাকে তালাক দেন তার বাবা রণজিৎ কুমার। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করেন রণজিৎ। কিন্তু কিছুদিন পরে বিধান আলোচনা করে মাকে তাদের সংসারে ফিরে আনেন। এতে ওই সমাজ থেকে তাদেরকে একঘরো করা হয়।

যা নিয়ে শিশু নন্দিনীর বাবা নলিনী মোহনের সাথে তাদের ঝগড়া বিবাদ হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয় বিধান চন্দ্র। সেই ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে নলিনীর পরিবারের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করতে থাকে। দীর্ঘ এক বছর আগের ঝগড়ার ক্ষোভ মিটাতে কিছুদিন আগে নন্দিনীর বড় ভাই যোতিষ্ঠিকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু স্থানীয়দের কারণে সেটা করতে ব্যর্থ হয় বিধান।

প্রতিশোধের দ্বিতীয় পরিকল্পনা মোতাবেক সোমবার বিকেলে নন্দিনী ও অপর এক শিশুসহ বাড়ির উঠানে মোবাইলে টিকটক দেখছিল বিধান। এরপর অপর শিশুটি চলে গেলে তার মোবাইলে চার্জ শেষ হয়। তখন মোবাইল চার্জে দিয়ে বিস্কিট মুখে দিয়ে পুনরায় উঠানে আসে বিধান।

এ সময় শিশু নন্দিনী রায় বিস্কিট চাইলে তাকে বিস্কিট দিতে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। এরপর শিশু নন্দিনীকে বিস্কুট খাইয়ে গলাটিপে হত্যা করে লাশ বস্তায় ভড়িয়ে রাখে বলে দাবি করেছে ঘাতক বিধান।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘাতক দাবি করে প্রথমে নিজ বাড়ির পাশে পাটক্ষেত গর্ত করে লাশ পুতে রাখতে। স্থানীয়রা জানতে পেলে তিনি (বিধান) জানান ছাগল মারা গেছে তা পুঁতে রাখতে হবে।

দুর্গন্ধ হবে জন্য স্থানীয়রা বাঁধা দিলে পরিকল্পনা পাল্টে নন্দিনীর বাড়ির পিছনের ভুট্টা ক্ষেতে গর্ত করে এবং বিকেল ৫টার পরেই সূর্যের আলোতে নন্দিনীর বাড়ির সামনে দিয়ে তারই বস্তাবন্দি নন্দনীর লাশ নিয়ে তারই বাড়ির পাশের ভুট্টা ক্ষেতে পুঁতে রাখে খুনি বিধান চন্দ্র।

এতসব কাজ করার সময় বিধানের বাড়িতে কেউ ছিল না। বাবা-মা দু'জনে বাড়ির বাহিরে থাকায় এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমিত করে বলে দাবি ঘাতকের। খুনি বিধান চন্দ্র এমন ভাবেই নন্দিনী হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন আদালতে।

স্থানীয়রা জানান, বিধানের মা একাধিক বার ওই সংসার ছেড়ে গেছেন এবং পুনরায় ফিরেও আসেন। যা নিয়ে ওই সমাজ থেকে এক ঘরো করা হয় এবং একবার মেনেও নিয়েছিল সমাজ। কিন্তু গত এক বছর ধরে এক ঘরো হয়ে থাকতে হয়েছে বিধানের পরিবারকে।

এ কারণে বিধানের মা মমতার প্রতি এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে তার বাড়ি ঘরে হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ক্ষোভের সাথে বহিরাগতরা যুক্ত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

নন্দিনীর বাবা মা বলছেন, এক বছর আগের বিরোধের ক্ষোভ নয়, সোনার দুল ছিনতাই করতে নন্দিনীকে হত্যা করেছে বিধান। সেই বিধানসহ আসামিদের ফাঁসি চান তারা।

পুলিশের উওর হামলা ভাঙচুরের ঘটনায় আদিতমারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে অজ্ঞাত ১২০০ থেকে ১৫০০ জনের বিরুদ্ধে বুধবার রাতে একটি মামলা দায়ের করে। সে মামলায় দাবি করা হয় তাদের ৩৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

পুলিশের ৩টি গাড়ি ভাঙচুর করে ৯ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করেছে হামলাকারীরা। আদিতমারী উপজেলা প্রশাসনের স্টাফ আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার অপর একটি মামলা দায়ের করেন। সে মামলায়ও অজ্ঞাত ১২০০-১৫০০ জনকে বিবাদী করা হয়েছে। তবে এ মামলায় ক্ষয়ক্ষতি দেখানো হয়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ৪শ’ টাকা। দুই মামলায় প্রায় ৩ হাজার আসামি।

সরকারি কাজে বাধা ও সরকারি সম্পদ বিনষ্টের দুইটি মামলা হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এরই মধ্যে মামলায় গ্রেপ্তার আতংকে রয়েছেন গ্রামবাসী। অনেক বাড়িই রাতে থাকছে পুরুষ শুন্য। অনেক পরিবার তাদের স্কুল কলেজ পড়ুয়া সন্তানদের দুরে পাঠিয়েছেন গ্রেপ্তার এড়াতে।

নিরাপরাধ মানুষদের হয়রানি না করতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

তিনি বলেছেন,যারা প্রশাসনের ওপর হামলা করেছে তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে হবে। তবে সাধারণ মানুষ যারা এ অপরাধি জড়িত নয় তাদেরকে হয়রানি করা হবে না।

লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, নন্দিনী হত্যাকাণ্ডের চার্জশিট দ্রুত সময়ে দেয়া চেষ্টা চলছে। সর্বচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে চার্জশীট দাখিলের চেষ্টা রয়েছে।

আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। আদালতে হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টসহ কিছু পরীক্ষা নীরিক্ষর প্রতিবেদন দরকার। যা পেতে একটু সময় লাগছে। এসব পেলেই চার্জশীট দাখিল করা হবে।

সরকারি কাজে বাধা ঘটনায় যে দুই মামলা হয়েছে। সে মামলায় কোন গ্রেপ্তার নেই। মূলত নিরাপরাধ মানুষকে হয়রানি না করতে ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের সনাক্ত করা হচ্ছে। এসব সুষ্ঠু তদন্ত করে তারপর প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হবে। এজন্য এ দুই মামলার আসামিদের ব্যাপারে একটু সময় নেয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন পুলিশ সুপার।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
USA VS Australia
Scheduled
20 Jun, 01:00 AM
VS
World Cup