


গ্যাস সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে। প্রায় ১৫ দিন ধরে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ গ্যাস সরবরাহের পর বুধবার থেকে জেলার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
কারখানার চাকা থেমে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী। দীর্ঘস্থায়ী এ সংকটে রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও শিল্প অর্থনীতি নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকেই গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে। কখনো চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, আবার কখনো এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পেয়েও কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হচ্ছিল। কিন্তু বুধবার থেকে সরবরাহ একেবারে শূন্যে নেমে আসায় অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
১২ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে
যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন জানান, তাদের শিল্পপার্কে ছয়টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে টায়ার ও পাওয়ার প্ল্যান্ট ছাড়া বাকি চারটি প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করেন।
তিনি বলেন, শিল্পপার্কের কারখানাগুলোর দৈনিক অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এত কম গ্যাসে উৎপাদন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। বুধবার রাত ১২টা থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
উৎপাদন বন্ধ স্টার সিরামিকসেও
স্টার সিরামিকসের প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা পল্লব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানেও বেশ কিছুদিন ধরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার দুপুর থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্যাস সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো সম্ভব না হলে অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
এসএম স্পিনিংয়ে প্রতিদিন দেড় কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা
এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। বুধবার বিকেল পৌনে ৪টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে পুরো উৎপাদন কার্যক্রম থেমে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
একইভাবে স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ জানান, বুধবার বিকেল ৩টা থেকে তাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শিল্পপার্কে ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। কয়েক দিন ধরে গ্যাস সংকট চললেও বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সরবরাহ একেবারে শূন্য হয়ে যায়। এতে শিল্পপার্কের সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
শ্রমিকদের মধ্যে এ নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কয়েকজন শ্রমিক জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় আগে থেকেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। এখন পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার কাজও বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টও বন্ধ
হবিগঞ্জের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রও চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একই সঙ্গে উৎপাদন ও বিদ্যুৎ দুই দিক থেকেই বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে শিল্পখাত।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। আরও কিছু প্রতিষ্ঠান আংশিকভাবে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত।
গ্যাস সরবরাহে বৈষম্যের অভিযোগ
এদিকে গ্যাস সরবরাহে বৈষম্যের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, হবিগঞ্জের সব শিল্পকারখানায় একইভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা হয়নি। কিছু প্রতিষ্ঠানে এখনো গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। ফলে একই এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতীয় সংকটের কথা বলছে গ্যাস কর্তৃপক্ষ
জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকট একটি জাতীয় সমস্যা। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ সংকট শুরু হয়েছে এবং এ বিষয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমাতে হয়েছে। তবে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ক্ষতির মুখে রপ্তানি ও কর্মসংস্থান
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতি শুধু উৎপাদন বন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি অর্ডার বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে। এতে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। পাশাপাশি হবিগঞ্জের শিল্প অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে।
এ অবস্থায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বচ্ছ, সুষম ও বৈষম্যহীনভাবে গ্যাস বণ্টনের দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা। তাদের মতে, দ্রুত সংকটের সমাধান না হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।