


জমি কেনা কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ডে নিজের বা উত্তরাধিকারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা বা নামজারি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক স্পষ্টীকরণে ওয়ারিশদের জন্য নিয়ম আরও পরিষ্কার করা হয়েছে। জমি ভাগ-বাটোয়ারা না হলে সব ওয়ারিশের নামে যৌথভাবে একই খতিয়ানে নামজারি করা যাবে; আর পৃথক খতিয়ান করতে হলে প্রয়োজন হবে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসানের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে এ নিয়ম স্পষ্ট করা হয়েছে।
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে বণ্টননামা বা আপস-রফা না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম একসঙ্গে একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথভাবে নামজারি করা যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য হিস্যাও খতিয়ানে উল্লেখ করা হবে। শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না।
যদিও ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নিয়ে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা দলিলের ভিত্তিতে পৃথক নামজারি করা যাবে।
অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির জমি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার পর দুটি পদ্ধতিতে নামজারি করা সম্ভব- সব ওয়ারিশের নামে যৌথভাবে একই খতিয়ানে নামজারি অথবা বণ্টননামার ভিত্তিতে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান তৈরি করে নামজারি।
যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ওয়ারিশ সনদ আবেদনপত্রের সঙ্গে দাখিল করতে হয়।
নামজারি কেন জরুরি
জমির মালিকানা পাওয়ার পর সময়মতো নামজারি না করলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জটিলতায় পড়তে হতে পারে। সরকারি রেকর্ডে নিজের নাম না থাকলে জমি বিক্রি, হেবা বা দানপত্র করার সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি জমি নিয়ে বিরোধ ও অবৈধ দখলের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এ ছাড়া সরকারি খতিয়ানে নাম না থাকলে নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের ক্ষেত্রেও সমস্যা হতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নামজারি-জমাভাগ ও জমা একত্রীকরণের মাধ্যমে ভূমির রেকর্ড হালনাগাদ করা যায় এবং ওয়ারিশ অনুযায়ী হিস্যা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে।
অনলাইনে নামজারি করতে যা লাগতে পারে
ডিজিটাল ব্যবস্থায় অনলাইনে নামজারির আবেদন করা যায়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি ব্যবস্থায় আবেদন ও পরবর্তী কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ রয়েছে।
সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে-
বন্ধিত দলিলের কপি ও সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের কপি;
আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি;
দাগ নম্বরসহ জমির বিস্তারিত বিবরণ;
উত্তরাধিকার সূত্রে হলে ওয়ারিশ সনদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মৃত্যু সনদ;
হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা;
আদালতের রায়, আদেশ বা ডিক্রি থাকলে তার প্রয়োজনীয় কপি;
প্রযোজ্য অন্যান্য কাগজপত্র।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নামজারি-সংক্রান্ত সেবার তালিকাতেও মূল দলিলের অনুলিপি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণক দাখিলের কথা উল্লেখ রয়েছে।
নামজারি করতে কত সময় লাগে
ই-নামজারি ব্যবস্থায় আবেদন যাচাই-বাছাই ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সাধারণভাবে ২৮ দিনের মধ্যে নামজারি নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। পুরোনো ম্যানুয়াল ব্যবস্থায় সময়সীমা ছিল ৪৫ দিন।
যদিও কোনো আবেদন অসম্পূর্ণ থাকলে, তথ্যের অসঙ্গতি থাকলে বা অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে বাস্তবে সময় ভিন্ন হতে পারে।
আগে নামজারি করা থাকলে কী করবেন
যাদের জমির নামজারি আগে থেকেই সম্পন্ন হয়েছে, তাদের নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই। তবে জমির রেকর্ড ডিজিটাল ব্যবস্থায় হালনাগাদ হয়েছে কি না, তা অনলাইনে যাচাই করে রাখা নিরাপদ।
উত্তরাধিকারীদের জমিতে কোন ক্ষেত্রে বণ্টননামা লাগবে
এখানেই নতুন নিয়মটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সব ওয়ারিশের নামে যৌথ খতিয়ান করতে বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন নেই। ওয়ারিশ সনদের ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তির মোট জমিতে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করে যৌথ নামজারি করা আইনসিদ্ধ।
অন্যদিকে, ওয়ারিশরা যদি জমাভাগ করে আলাদা আলাদা খতিয়ান করতে চান এবং প্রত্যেকে নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে চান, তাহলে কে কোন দাগে বা দাগের কোন অংশে জমি ভোগদখল করবেন তা নির্ধারণ করে নিবন্ধিত আপস-বণ্টননামা দলিল করতে হবে। ওই দলিলের ভিত্তিতে পৃথক পৃথক নামজারি খতিয়ান করা যাবে।
জমি কিনলে কী করবেন
দলিলের মাধ্যমে জমি কেনার পর রেজিস্ট্রি দলিলের ভিত্তিতে নতুন মালিকের নামে নামজারি করা প্রয়োজন। উত্তরাধিকার বা রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তনের পর খতিয়ানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার ব্যবস্থাই নামজারি বা মিউটেশন।
ভুল তথ্য থাকলে
নামজারি খতিয়ানে ভুল তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সংশোধনের আবেদন করা যায়। আগের নামজারি বা খতিয়ানের তথ্য যাচাই করে পরবর্তী মালিকানা পরিবর্তনের আবেদন করতে হয়।
অনলাইনে কোথায় আবেদন করবেন
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে নামজারির আবেদন করা যায়। সরকারি ভূমি পোর্টালে অনলাইনে নামজারি, জমাভাগ ও জমা একত্রীকরণের সেবা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। ভূমিসেবা-সংক্রান্ত সহায়তার জন্য সরকারি হটলাইন ১৬১২২-এ যোগাযোগ করা যায়।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির ক্ষেত্রে নতুন স্পষ্টীকরণের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত ওয়ারিশদের মালিকানা সরকারি রেকর্ডে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং বণ্টননামা না থাকার কারণে বৈধ যৌথ নামজারির আবেদন অযথা নামঞ্জুর না করা। আর যারা নিজেদের অংশ আলাদা করে পৃথক খতিয়ান করতে চান, তাদের জন্য নিবন্ধিত বণ্টননামার ভিত্তিতে জমাভাগ ও পৃথক নামজারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।