মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভূমিহীন সেলিম এখন নিজেই গবেষক

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম
ছবি: এনপিবি নিউজ
expand

নিজের কোনো জমি নেই। নেই নিজের বাসস্থান। থাকেন ভাড়া বাসায়। নিজের জমিজমা না থাকলেও কী হবে, ভূমিসংক্রান্ত নানা জটিলতাগুলো খুব ভাবায় সেলিম মিয়াকে। প্রতিনিয়ত ভাবেন, কেন বাড়ছে জমিজমা নিয়ে খুনখারাবি ও মারামারি? নারীরা কেন বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের অধিকার থেকে?

ভূমি সংক্রান্ত এসব নানা জটিলতা দূর করতে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দৈনিকে উঠে আসা হাজার হাজার খবর সংগ্রহ করে সেঁটে দিয়েছেন ঘরের চার দেয়ালজুড়ে। নাম দিয়েছেন 'ভূমি গবেষণাগার ও তথ্য ভাণ্ডার।' তার উদ্ভাবিত 'ডিজিটাল ভূমি কার্ড' চালু হলে অবসান হবে 'জোর যার, মুলুক তার' নীতি।

জানা যায়, উচ্চমাধ্যমিক পাস করা সেলিম মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পার্শ্ববর্তী চর বিরহিমের সাতালস্কর গ্রামে।

১৯৯৫ সালে তিস্তার ভাঙনে ভিটেমাটি হারান তিনি। বসবাস শুরু করেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরে ভাড়া বাসায়। জীবিকার তাগিদে একটি এনজিওতে চাকরি নেন। বছর খানেক পর বন্ধ হয়ে যায় সেটিও। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুরু করেন মামলার এজাহার লেখালেখির কাজ। আর এজাহার লিখতে গিয়ে তিনি দেখেন, 'অধিকাংশ মামলাই ভুমি নিয়ে। চিন্তায় পড়েন সেলিম। সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে খুঁজতে থাকেন ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা থেকে মুক্তির উপায়। গড়ে তোলেন 'ভূমি গবেষণাগার।'

সেলিমের গবেষণাগারে দেখা যায়, '২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত ভূমি নিয়ে সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষে নিহত, আহত, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাবলী নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর সংগ্রহ করে ঘরের চার দেয়ালে আটা দিয়ে সেঁটে রেখেছেন তিনি। এ ছাড়া ষ্ট্যাম্প খরচের হিসাব, ভূমি জরিপের ভুল-ত্রুটি, জালদলিল তৈরির কারখানা, ভূমি জবরদখল ও ভূমিদস্যুতা, অফিসে ছেঁড়া ফাটা গায়েব, সাবেক ছিটমহলে ভূমি সমস্যা, রেলওয়ের জমি জবরদখল, আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা, ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যা, সাবরেজিট্রার অফিসে সমস্যা, সমাজের কুচক্রী মানুষ কর্তৃক বিভিন্ন জাল জালিয়াতির মতো বিষয়গুলোর হাজার হাজার পত্রিকা কাটিং সাঁটিয়েছেন স্বাধীন এ গবেষক।

হিসাব রেখেছেন, জানুয়ারি ২০১৩-ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত দেশে ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে খুনের সংখ্যা। তার সংরক্ষিত হিসাব মতে, এই এই ১৩ বছরে দেশে মানুষ খুন হয়েছেন ২৪০২ জনের উর্ধ্বে।

এরমধ্যে রংপুর বিভাগে ৪৭৭জন, রাজশাহী বিভাগে ৪৩৪ জন, খুলনা বিভাগে ২৩৪ জন, বরিশাল বিভাগে ১১৮ জন, ঢাকা বিভাগে ৪০৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১৭জন, সিলেট বিভাগে ১৮৬ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৩২৬ জন এবং আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। এতেই খান্ত দেননি তিনি। সমাধানকল্পে তৈরি করেছেন একটি 'ডিজিটাল ভূমি কার্ড।'

সেলিম মিয়ার ভাষ্য, প্রত্যেক ভূমি মালিকদের কাছে থাকবে এই ডিজিটাল কার্ড। যেখানে থাকবে প্রত্যেকের মৃত্যু তারিখ ও মোট জমির পরিমাণ। থাকবে ওয়ারিশের তালিকা। থাকবে জমি বেচা-কেনার কলাম। কিনলে যোগ হবে, বিক্রি করলে বিয়োগ হবে। সরকারিভাবে এই কার্ডের ব্যবস্থা করতে পারলে কেউ কাউকে আর জমি থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। দূর হবে 'জোর যার, মুলুক তার' ও 'লাঠি যার, জমি তার' নীতি। বন্ধ হবে ভূমি নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামার মতো ঘটনা, কমবে অনাকাঙ্ক্ষিত এই মৃত্যু।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank