মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মায়ের সাথে জেলে ছোট্ট শিশু, এতিমখানায় নির্ঘুম রাত কাটে দুই বোনের

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
এতিমখানায় নির্ঘুম রাত কাটে দুই বোনের
expand

মাটির দেয়াল, টিনের চাল- তিন কক্ষের ছোট্ট একটি ঘর। উঠানে খেলার কথা যে দুই শিশুর, তারা এখন এতিমখানার বারান্দায় বসে মাকে খোঁজে। আর দেড় বছরের আরেকটি শিশু ঘুমাচ্ছে কারাগারের এক কনকনে কক্ষে, মায়ের বুকের ওমে। এই মা- ফাতেমা বেগম। স্বামী খুন হওয়ার চার মাসের মাথায় তিনি নিজেই এখন হত্যা মামলার নয়, বরং ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলার আসামি হয়ে জেলে।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের কামিতার পাড়া গ্রাম। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল কবির বাজার থেকে তাড়া করে বাড়িতে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মোহাম্মদ কাশেমকে। অভিযোগ ওঠে রাসেলসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে। ফাতেমা বেগম তখন স্বামীহারা, তিন সন্তানের একা মা। কিন্তু গল্পটা সেখানেই থামেনি।

কাশেম হত্যার ঠিক এক মাস পর, ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন অভিযুক্ত রাসেলের মা নুর জাহান বেগম। ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট দায়ের করা সেই অভিযোগে আসামি করা হয় খোদ নিহত কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর ও ননদসহ সাতজনকে।

আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব দেয় মহেশখালী থানাকে। তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহেরুল ইসলাম ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানান, ঘটনার সত্যতা মিলেছে। আর সেই প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই ৩১ অক্টোবর রাতে পুলিশ হানা দেয় ফাতেমাদের বাড়িতে। গ্রেপ্তার হন ফাতেমা, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম ও বেড়াতে আসা মেয়ে নাছিমা আকতার। ১ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির করা হলে দুজন জামিন পেলেও দেড় বছরের শিশুসন্তানসহ ফাতেমাকে পাঠানো হয় কারাগারে।

আদালতে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে মিলেছে একাধিক অসংগতি। বাদীর দেওয়া সাতজন সাক্ষীর বাইরে আর কারও বক্তব্য নেননি তদন্ত কর্মকর্তা। এমনকি সেই সাত সাক্ষীর জবানবন্দিতেও দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলন পর্যন্ত প্রায় হুবহু মিলে যায়।

প্রতিবেদনে এসআই মোজাহেরুল ইসলাম লিখেছেন, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, আলামত জব্দের চেষ্টা করেছেন, প্রকাশ্যে-গোপনে তদন্ত করেছেন, এমনকি 'গুপ্তচর নিয়োগ' পর্যন্ত করেছেন। কিন্তু প্রতিবেদক যখন তার মুখোমুখি হন, ভিন্ন কথা বলেন তিনি নিজেই।

তিনি বলেন, আদালতে দেওয়া অভিযোগের তদন্তে বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই তাদের বাইরে আর কারও সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি।

আরও চমকপ্রদ তথ্য মেলে প্রতিবেদনের ভেতরেই। যেখানে বলা হয়েছে, পাশের একটি হত্যা মামলায় নুর জাহান বেগমের ছেলে রাসেলকে 'অন্যায়ভাবে' আসামি করা হয়েছে। অথচ সেই হত্যা মামলার ভিকটিম যে খোদ ফাতেমার স্বামী কাশেম, প্রতিবেদনে তার কোনো উল্লেখই নেই।

জিজ্ঞাসা করা হলে মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, এরকম লেখার কোনো সুযোগ নেই, আগের ঘটনা তাই আমার মনে পড়ছে না।

তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের সাক্ষী দেখানো হয়েছে, সেই তালিকার তিনজন- নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগম জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। তারা বলেন, ফাতেমার বিরুদ্ধে করা মামলায় তারা কোনো সাক্ষ্যই দেননি, এমনকি সাক্ষীর তালিকায় তাদের নাম কীভাবে উঠল তাও জানেন না। ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না জানতে চাইলে তাদের সরল জবাব- সেদিন কিছুই ঘটেনি।

তাদের দাবি, মামলায় যে ভাঙচুরের কথা বলা হয়েছে, তা আসলে ঘটেছিল ২৩ এপ্রিল, কাশেম হত্যার দিনই- উত্তেজিত এলাকাবাসীর হাতে, যেখানে কাশেমের পরিবারের কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম, মমতাজ বেগমসহ একাধিক জনের সঙ্গে কথা বলেও একই তথ্য মেলে- ২৪ মে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তাদের ভাষ্য, স্বামীহারা কাশেমের পরিবারকে চাপে ফেলতে ও প্রতিশোধ নিতেই সাজানো হয়েছে এই মামলা।

ফাতেমার শাশুড়ি রাশেদা বেগমের কণ্ঠে ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব একসঙ্গে ঝরে পড়ে। তিনি বলেন, আমার ছেলেকে হত্যা করে আমাদের বিরুদ্ধেই উল্টো মিথ্যা মামলা করেছে। আমরা জানতেই পারিনি যে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করেছে এবং ওয়ারেন্ট হয়েছে। এখন আমার পুত্রবধূকে কারাগারে পাঠিয়ে আসামিরা আমাদের হুমকি দিচ্ছে।

সরেজমিনে ফাতেমার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় জীবনযুদ্ধের আরেক ছবি। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া মেয়ে রাজমিন আকতার আর প্রথম শ্রেণির মিশকাত জান্নাত এখন কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা সুমাইয়া (রা.) এতিমখানায়। মাকে কাছে না পেয়ে কাঁদছে শিশু দুটি। স্বামী হারানোর পর সন্তানদের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন ফাতেমা।

কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হক বলেন, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেনি। কারও ঘরবাড়ি ভাঙচুরও করা হয়নি। কাশেমকে হত্যার পর তার পরিবারকে দুর্বল করতে তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় দেড় বছরের শিশুসহ ফাতেমা এখন কারাগারে। আর বাড়িতে ছোট ছোট দুটি শিশু মাকে ছাড়া রয়েছে।

কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ কামাল জানান, ঘটনা জানার পর তিনি ইউপি সদস্যকে এলাকায় পাঠিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, নিহত কাশেম ও অভিযুক্ত রাসেল ছিলেন আত্মীয়। সামান্য টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে কবির বাজার থেকে দৌড়ানি দিয়ে ঘরের দরজার সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় কাশেমকে। সে সময় নিহতের পরিবার শোক পালন করছিল, আর তখনই উত্তেজিত লোকজন তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর-লুটপাট করে। সেই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে আসামিপক্ষ পরে আদালতে মামলা দায়ের করে।

চেয়ারম্যান জানান, এই মামলাতেই ১ সেপ্টেম্বর তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, দুজন জামিন পেলেও কোলের সন্তানসহ ফাতেমাকে পাঠানো হয় কারাগারে। ফাতেমার জামিনের জন্য বিনা ফিতে আদালতে দাঁড়ানোর কথাও জানান তিনি।

মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা প্রতুল সেন বলেন, ওসি (তদন্ত) হিসেবে থানার প্রতিটি মামলা তদারকির দায়িত্ব তার হলেও এই মামলার বিস্তারিত তার মনে নেই, জেনে পরে জানাবেন। তবে সব সাক্ষীর জবানবন্দি হুবহু মিলে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আদালতের দৃষ্টিগোচর হলে আদালতই ব্যবস্থা নেবে।

স্থানীয় সচেতন মহল ও নেটিজেনরা বলছেন, এই ঘটনা একদিকে একটি হত্যা মামলা, অন্যদিকে তার প্রতিক্রিয়ায় দাঁড় করানো পাল্টা মামলা। দুটোই সামনে আনে বাংলাদেশের নিম্ন আদালতভিত্তিক তদন্ত ব্যবস্থার এক গভীর দুর্বলতা। যেখানে তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করছেন বাদীর সাক্ষীর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, সেখানে প্রশ্ন ওঠে- ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় স্বাধীন সাক্ষ্যগ্রহণের যে বিধান, তার বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে। হুবহু মিলে যাওয়া সাক্ষ্য, অস্বীকৃত সাক্ষী, আর ভিকটিম পরিবারের বিরুদ্ধে করা মামলায় নিজেই ভিকটিম পরিবারের সদস্য কারাগারে যাওয়া। এই সব মিলিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জবাবদিহির প্রশ্ন এখন অনিবার্য।

শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে যারা, তারা এই বিরোধের কোনো পক্ষই নয়- দুই শিশু এতিমখানার বারান্দায় মায়ের অপেক্ষায়, আর একটি দেড় বছরের শিশু কারাগারের দেয়ালের ভেতরে বেড়ে উঠছে তার জন্মের প্রথম বছরগুলো।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank