


কক্সবাজারের মহেশখালীতে গত ২১ জুলাই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ)।
দুর্ঘটনার পর থেকেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহে দৈনিক ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও টার্মিনালটির মেরামত শেষ হয়নি। বরং চালুর সম্ভাব্য সময় কয়েক দফা পিছিয়েছে।
সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী গত শনিবার থেকে আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি।
এখন বুধবার থেকে একটি বয়লার চালুর মাধ্যমে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে বলে জানানো হলেও সেটিও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আর পুরো সক্ষমতায় টার্মিনাল চালু করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে এক্সিলারেট এনার্জি।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সারকারখানা, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক খাতে গ্যাসসংকট তীব্র হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিং বেড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা জানান, তারাও পরিস্থিতি নিয়ে চরম অস্বস্তিতে রয়েছেন। সাধারণ মানুষ প্রতিদিন জানতে চাইছেন, কবে গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো উত্তর তাদের কাছেও নেই।
কারণ, টার্মিনালটির মেরামত কখন শেষ হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট সময়সূচি দিচ্ছে না এক্সিলারেট এনার্জি। মেরামতকাজ পরিচালনা করছেন বিদেশি প্রকৌশলীরা এবং সেখানে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত শনিবার রাতে এক্সিলারেট এনার্জির প্রতিনিধিদের সঙ্গে জ্বালানি বিভাগের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে মেরামত শেষ করার জন্য প্রতিষ্ঠানটির ওপর জোরালো চাপ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার দীর্ঘসূত্রতা ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এর পেছনে ভূরাজনৈতিক কোনো প্রভাব থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
এমনকি জ্বালানি খাতের কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যেও এ ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত এমন কোনো আশঙ্কার পক্ষে প্রকাশ্য নথি, তথ্য বা সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ খন্দকার সালেক সুফি মনে করেন, দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতির ভিত্তিতে টার্মিনালটি সাধারণ পরিস্থিতিতে এক সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ থাকার কথা নয়। যদিও উত্তাল সমুদ্রে এ ধরনের মেরামত প্রযুক্তিগতভাবে জটিল, তবুও এক্সিলারেট এনার্জির মতো অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, এখানে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা সরকারকেই খতিয়ে দেখতে হবে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের কাছে দায়বদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হয়েও তারা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে না কবে কাজ শেষ হবে।
সরকারের উচিত তাদের তথ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজস্ব বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প পরিকল্পনা তৈরিরও তাগিদ দেন তিনি।
তার ভাষ্য, আজ এক্সিলারেটরের টার্মিনালে দুর্ঘটনা ঘটেছে, কাল অন্য টার্মিনালেও ঘটতে পারে। তাই একটি টার্মিনালের ওপর অতিনির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ।
জানা গেছে, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রভাব দীর্ঘদিনের। বর্তমানে দেশের মোট দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশই আসে মার্কিন প্রতিষ্ঠান শেভরনের পরিচালিত তিনটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে।
এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এক্সিলারেট এনার্জির। তারা একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পরিচালনার পাশাপাশি কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহেও যুক্ত।
এছাড়া নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাব্য প্রকল্পেও মার্কিন কোম্পানিগুলোর আগ্রহ রয়েছে। একই প্রকল্পগুলোতে চীনসহ অন্য কয়েকটি দেশের কোম্পানিও আগ্রহ দেখাচ্ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফর এবং জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘটনাকে এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো কোনো প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, এলএনজি টার্মিনাল ঘিরে ভূরাজনৈতিক চাপের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, আবার এটিকে সত্য বলার মতো তথ্যও নেই।
তবে এই সংকট একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দেওয়ার ফলই আজকের এই দুর্ভোগ। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র ও আশপাশে নতুন অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগের আগ্রহও রয়েছে। কিন্তু আমরা অনুসন্ধানের বদলে ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, গ্যাসসংকটে মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি সরকার গভীরভাবে উপলব্ধি করছে। দ্রুত মেরামতের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে জরুরি ভিত্তিতে যন্ত্রপাতি আনা হয়েছে। প্রকৌশলীরা দিন-রাত কাজ করছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত দুটি বয়লারের মধ্যে একটি চালু হলে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়বে এবং সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ কবে ফিরবে, সেই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। আর সেই অনিশ্চয়তাই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।