রবিবার
১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামী ব্যাংকের কক্সবাজার শাখায় টাকা উত্তোলনের হিড়িক

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম
ইসলামী ব্যাংকের কক্সবাজার শাখা
expand
ইসলামী ব্যাংকের কক্সবাজার শাখা

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ কক্সবাজার শাখায় হঠাৎ করেই গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। রবিবার বেলা ১২টা থেকে ব্যাংকটির কক্সবাজার শাখায় গিয়ে দেখা যায়, টাকা উত্তোলনের জন্য নারী-পুরুষ গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি, প্রতিটি কাউন্টারে তীব্র চাপ এবং কর্মকর্তাদের চারপাশে উদ্বিগ্ন মানুষের জটলা।

জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতা, চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা আলোচনা-সমালোচনার প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে গ্রাহকদের আচরণে। অনেকেই নিজেদের সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলে নিচ্ছেন।

ব্যাংকের ভেতরের দৃশ্য ছিল অনেকটা অস্বাভাবিক। নিচতলা থেকে সিঁড়ি হয়ে দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। অনেকেই সকাল থেকে অপেক্ষা করেও দ্রুত সেবা পাচ্ছিলেন না। শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে নারী গ্রাহকদেরও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কর্মকর্তারা গ্রাহকদের চাপ সামাল দিতে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন।

স্থানীয় সাংবাদিক ইমাম খাইয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাখাটির কয়েকটি ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ম্যানেজারের চারপাশে ঘিরে ধরেছে নারী-পুরুষ। প্রত্যেক অফিসারের টেবিলে জটলা। কথা বলার ফুরসত নেই। নিচতলা ও সিঁড়ি থেকে দোতলা পর্যন্ত একই অবস্থা। এটি কোনো ত্রাণ বিতরণের দৃশ্য নয়, এটি আস্থার সংকটের লাইন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশিদ আলম নিয়োগ পান। তবে তার দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

চেয়ারম্যানের প্রথম কর্মদিবসেই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও একাংশ গ্রাহক বিক্ষোভে অংশ নেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে নির্ধারিত বোর্ড সভা সরাসরি না হয়ে অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। একই সময়ে ব্যাংকের চেয়ারম্যান জুবাইদুর রহমান পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই ব্যাংকটিকে ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নতুন চেয়ারম্যানকে ঘিরে চলমান অস্থিরতার মধ্যে গত পাঁচ কার্যদিবসে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন গ্রাহকরা।

তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ৪ জুন পর্যন্ত চার কার্যদিবসে প্রায় ২ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর ৭ জুন একদিনেই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়।

ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এবং গ্রাহকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া উদ্বেগের কারণে এই অস্বাভাবিক উত্তোলন প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

গ্রাহকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে দেশের কয়েকটি সংকটাপন্ন ব্যাংকের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আর্থিক সংকটে পড়া অন্তত পাঁচটি ব্যাংকের বহু গ্রাহক এখনও তাদের আমানত স্বাভাবিকভাবে উত্তোলন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রায় দুই বছর পার হলেও অনেক আমানতকারী তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকর সমাধান এখনও দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্তদের। ফলে সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইসলামী ব্যাংকের অনেক গ্রাহক আগেভাগেই নিজেদের অর্থ নিরাপদে রাখতে ব্যাংকে ভিড় করছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকের গ্রাহক মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, আমি প্রায় ১২ বছর ধরে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক। কয়েকদিন ধরে নানা খবর দেখছি। পরিবার থেকেও টাকা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ এসেছে। তাই কিছু টাকা উত্তোলন করতে এসেছি। সত্যি বলতে ভয় থেকেই আসা।

ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, ব্যাংকের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। কিন্তু চারদিকে যেভাবে নানা কথা ছড়াচ্ছে, তাতে ঝুঁকি নিতে চাই না। প্রয়োজন না থাকলেও কিছু টাকা হাতে রাখতে চাচ্ছি।

গৃহিণী রহিমা খাতুন বলেন, আমার স্বামীর প্রবাসের টাকা এই ব্যাংকে জমা থাকে। হঠাৎ শুনছি মানুষ টাকা তুলছে। তাই আমরাও এসে কিছু টাকা তুলে নিচ্ছি। যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে তাহলে আবার জমা দেব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী গ্রাহক বলেন, আসলে আতঙ্কই মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছে। কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। তাই সবাই নিজের সঞ্চয় হাতে রাখতে চাইছে।

একজন প্রবীণ গ্রাহকের ভাষ্য, ব্যাংক টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপর। সেই বিশ্বাস যদি নড়ে যায়, তাহলে শুধু একটি ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক খাতই চাপে পড়ে। তাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

শাখাটিতে গ্রাহকদের অতিরিক্ত চাপ ও ব্যস্ততার কারণে ইসলামী ব্যাংক কক্সবাজার শাখার ব্যবস্থাপক বোরহান উদ্দিন কিংবা অন্য কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। ফলে এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে ব্যাংকে উপস্থিত একাধিক গ্রাহক জানান, দেশের কয়েকটি সংকটাপন্ন ব্যাংকের অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাদের দাবি, বিগত সরকারের আমলে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কয়েকটি ব্যাংকের আমানতকারীরা এখনও পুরোপুরি তাদের টাকা ফেরত পাননি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শহরের বাহারছড়া এলাকার বাসিন্দা আবদুল কাদের বলেন, আগের কয়েকটি ব্যাংকের গ্রাহকদের অবস্থা আমরা দেখেছি। মানুষ নিজের টাকার জন্য বছরের পর বছর ঘুরছে। তাই ঝুঁকি নিতে চাই না। কিছু টাকা হাতে রাখলে অন্তত নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

কলাতলী এলাকার ব্যবসায়ী নুরুল আমিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের খবর ছড়াচ্ছে। কোনটা সত্য, কোনটা গুজব বুঝতে পারছি না। কিন্তু যখন দেখি এত মানুষ টাকা তুলতে এসেছে, তখন আমরাও চিন্তিত হয়ে পড়ি।

নাজমা আক্তার নামের নারী আমানতকারী বলেন, আমাদের কষ্টের জমানো টাকা। কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আগে নিজের টাকা নিরাপদে রাখতে চাই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার ব্যাংকেই জমা রাখবো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক গ্রাহক বলেন, আমরা কাউকে দোষ দিতে চাই না। কিন্তু দেশের ব্যাংকিং খাতে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে সাধারণ মানুষের আস্থা অনেকটাই কমে গেছে। তাই অনেকেই সতর্কতার অংশ হিসেবে আমানতের একটি অংশ তুলে নিচ্ছেন।

গ্রাহকদের মতে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও স্বচ্ছভাবে পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে জানাতে হবে। অন্যথায় আতঙ্ক ও গুজবের কারণে আমানত প্রত্যাহারের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন গণমাধ্যমে বলেছেন, কিছু গ্রাহক আমানত তুলে নিচ্ছেন ঠিকই, তবে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ব্যাংকের ঋণ অনুমোদনসহ সব কার্যক্রম কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গ্রাহকরা নগদ অর্থ তুলছেন নাকি অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করছেন, তাও নজরদারিতে রয়েছে। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা দেবে বলেও তিনি জানান।

২০২৪ সালের আগস্টে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পর ইসলামী ব্যাংকের আমানত উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। দীর্ঘদিন পর ব্যাংকটির প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসছে বলেও মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলনের ঘটনা সেই আস্থার ভিত্তিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও একাংশ গ্রাহকদের আন্দোলনও অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনকারীরা দেশব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন এবং খুরশিদ আলমের পদত্যাগ দাবি করেছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো ব্যাংককে ঘিরে আস্থার সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ঢেউ পুরো ব্যাংকিং খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক গ্রাহক আমানত তুলে নিতে শুরু করলে তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয় এবং গুজব আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

সচেতন মহলের মতে, ব্যাংকিং খাত মূলত আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই আস্থায় ফাটল ধরলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
FIFA World Cup
LIVE
Netherlands VS Japan
Scheduled
Netherlands
- - -
Japan
World Cup